স্বপ্ন রোজ, নিজস্ব প্রতিবেদক: এগ্রো অর্গানিকা বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেন ৭ অক্টোবর ২০১৫। প্রসপেক্টাস এর তথ্য অনুযায়ী কোম্পানির পণ্য হিসেবে রয়েছে চাল,জাফরান,ইসবগুল,মশলা,ঘি,জেলি ও আচার।
সরেজমিনে ফ্যাক্টরিতে গিয়ে জানা যায় কোম্পানিটাতে শুধু আচার তৈরি করা হয়। আর বাহির থেকে চাল কিনে এনে প্যাকেটজাত করা হয়। আচার ছাড়া নিজস্ব অন্য কোন পণ্য নেই।
কোম্পানির শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা জানান বাইরের লোকদের সাথে কথা বলতে কর্তৃপক্ষ নিষেধ করেছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শ্রমিক জানায় - আচার তৈরি করা হয় তাছাড়া কোম্পানিটি বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে মাঝে মাঝে চাল প্যাকেটজাত করা হয়।
ফ্যাক্টরিতে কতজন শ্রমিক রয়েছেন জানতে চাইলে তিনি জানান -তারা ১০,১৫ জন আছেন।ফ্যাক্টরির ভিতর কি কি মেশিনারিজ রয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান -দুইটি মেশিন রয়েছে একটি দিয়ে চালের প্যাকেটজাত করে অন্যটি আচারের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিকের এক কর্মকর্তা জানান -কোম্পানিটাতে বছরে মৌসুমী আচার তৈরি হয়। আর চাল কিনে প্যাকেট করে। অন্য কোন পণ্য এখানে তৈরি হয় না। তবে গত দুই তিন বছরে পণ্যবাহী গাড়ি যাতায়াত করতে দেখেনি কেউ।বিসিক এরিয়া বা আশেপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই বুঝতে পারবেন গত ২/৩ বছরে এগ্রো অর্গানিকার এখানে গাড়ি তো দুরের কথা একটা ভ্যানগাড়িও পণ্য নিয়ে যাতায়াত করেনি।কয়েক মাস হল ফ্যাক্টরিতে নতুন কয়েকজন শ্রমিক এনেছে দূর থেকে। এতদিন কোনরকম চালু ছিল।
এগ্রো অর্গানিকার ওয়েবসাইটে ক্রেতা তালিকায় রয়েছে -স্বপ্ন সুপার শপ, দারাজ, চাল ডাল ডট কম, আগোরা, জেনারেল ফার্মাসিটিক্যালস, লা মেরিডিয়ান, মিনা বাজার, আরো অসংখ্য বড় বড় কোম্পানির নাম।
স্বপ্ন সুপার শপ এর কয়েকটি আউটলেট ঘুরেও এগ্রো অর্গানিকার কোন প্রোডাক্ট পাওয়া যায়নি। স্বপ্ন সুপার শপ এর হেড অফিসে যোগাযোগ করা হলে জানান -এগ্রো অর্গানিকার আচার পাওয়া যায় তবে সব সময় আসে না।

দারাজ এর সাথে যোগাযোগ করা হলে জানান -এগ্রো অর্গানিকা বেশ কিছু দিন হলো একটি স্টোর খুলেছে। স্টোরে পণ্য নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান -সেটা তো আমি জানিনা।সেলারের সাথে যোগাযোগ করে জানেন তাদের পণ্য নেই কেন,
তিনি আরো জানান-কোনো খরচ ছাড়াই দারাজে সেলার হিসেবে যে কেউ সাইন আপ করে সহজে অনলাইন ব্যবসা করতে পারে।পণ্য বিক্রি করবে কি, করবে না এটা কেবল সেলারই জানে। স্টোরে সেলারের সাথে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন।

চাল ডাল ডট কম এর ওয়েবসাইটে এগ্রো অর্গানিকার খুসবো নামের কিছু পণ্য দেখা যায় যেমন খুশবো আচার, খুশবো ঘি,খুশবো বাসমতি ইত্যাদি । তবে সবগুলো পণ্যই স্টক আউট। প্রতিবেদক প্রতিবেদন করার উদ্দেশ্যে মাসখানেক ধরে চাল ডাল ডট কমে রি-স্টক রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে প্রতিবেদন করার আগ পর্যন্ত পণ্য স্টক হয়নি।
এগ্রো অর্গানিকার ওয়েবসাইটে ক্রেতা তালিকায় থাকা অধিকাংশ কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে জানা যায় এগ্রো অর্গানিকা নামের কোন কোম্পানি তারা চেনেন না। তাহলে এগ্রো অর্গানিকা কোথায় এবং কাদের কাছে পণ্য বিক্রি করে এ প্রশ্নের উত্তর কে দিবে?
এগ্রো অর্গানিকা কোম্পানিটির হাজারীবাগের ওয়্যার হাউজটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি কিন্তু প্রসপেক্টাস জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সগৌরবে।বাৎসরিক খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ১ কোটি টাকা। ২৬ লাখ টাকার কোম্পানির কোটি টাকার ওয়্যারহাউস। এই আয় ব্যয় এর কৌশলেই আটকে যাবে বিনিয়োগকারীরা।সুকৌশলে একটি উৎপাদনহীন কোম্পানির কাগজের কলমে কোটি টাকা রেভিনিউ দেখাচ্ছে।
এই চমকপ্রদক রেভিনিউ কাগজে কলমে উৎপাদন করেছেন শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের পরিচালকগণ। কারণ একটাই তা-হলো প্লেসমেন্ট শেয়ার। শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের পরিচালকগণ তাদের আত্মীয়-স্বজন ও কোম্পানির নামে রেখে দিয়েছে কোটি কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার। যেমন-মোঃ মতিউর রহমান শেয়ার সংখ্যা -১৫০,০০০ মোঃ আফজালুর রহমান শেয়ার সংখ্যা -৬৫,০০০ শাহানা তাসনিন লোপা শেয়ার সংখ্যা-১০০,০০০ মোঃ মাহাবুবুর রহমান শেয়ার সংখ্যা-১০০,০০০ হেলেন রহমান শেয়ার সংখ্যা-১০০,০০০ ইউনিভার্সেল ট্রেডিং শেয়ার সংখ্যা-১৫০,০০০ বেঙ্গল অ্যাসেট হোল্ডিং লিমিটেড শেয়ার সংখ্যা-৩৬০,০০০, রাশেদুল ইসলাম শেয়ার সংখ্যা-২০০,০০০।অনুসন্ধানে জানা যায় ইস্যু ফি এর পরিবর্তে উক্ত প্লেসমেন্ট শেয়ার শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডকে এগ্রো অর্গানিকা দিয়েছে।

২০১৫ সালের পাবলিক ইস্যু রুলসের ৩(২)(ডি)-তে বলা হয়, ইস্যু ম্যানেজার ইস্যুয়ারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারবে না এবং শেয়ার ধারণ করতে পারবে না। একই কথা বলা আছে কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর রুলসের ৮ এর ৩-এতেও। মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোন কিছু গোপন করলে বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনে রয়েছে শাস্তির বিধান
প্রতিবেদক শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের সিইও জনাব মোঃ আলমগীর হোসাইন এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান -কোম্পানির পক্ষ থেকে আপনার সাথে যোগাযোগ করা হবে।
প্রসপেক্টাস এর তথ্য অনুযায়ী ৩০শে জুন ২০১৭ সালে কোম্পানিটির পেইড আপ ক্যাপিটাল ছিল মাত্র ২,৬৬৬,৭০০ টাকা। যা ৩০ শে জুন ২০১৭,২০১৮,২০১৯ এই তিন বছরে পেইড আপ ক্যাপিটাল একই পরিমাণ। এবং ৩০ শে জুন ২০২০ সালে শেয়ার বাজারে আনার উদ্দেশ্যে হঠাৎ করে পেইড আপ ক্যাপিটাল বৃদ্ধি পায় ৩৮৩,০০০,০০০ টাকা।মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২৬ লাখ টাকার কোম্পানিটি ৩৮ কোটি টাকার কোম্পানি বানানো হয়। দ্রুত পেইড আপ ক্যাপিটাল বাড়ানোর উদ্দেশ্যই হলো প্লেসমেন্ট শেয়ার বাণিজ্য। নিজস্ব কিছুই নেই এগ্রো অর্গানিকার তবও আছে শুধু কোটি কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার।
এছাড়া প্রসপেক্টাস এর তথ্য অনুযায়ী জানা যায়- nrb bank থেকে লোন নিয়েছে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।যার সুদের হার ৯ শতাংশ। অথচ প্রসপেক্টাস এর তথ্য অনুযায়ী কোম্পানিটির বাৎসরিক আয়- ২০১৬-২০২১ সালে ২১কোটি টাকা, ২০১৮ সালে প্রায় ৩০ কোটি টাকা,২০১৯ সালে ৩৮ কোটি টাকা,২০২০ সালে প্রায় ৪১ কোটি টাকা,২০২১ সালে ৪৩ কোটি টাকা,২০২২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ৩৬ কোটি টাকা।প্রসপেক্টাস এর তথ্য অনুযায়ী এগ্রো অর্গানিকার আয় প্রতিমাসে ৩ কোটি টাকাও বেশি।প্রশ্ন হল যে কোম্পানিটা প্রতি মাসে আয় করে ৩ কোটি টাকারও বেশি সে কেন মাত্র ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা লোন নিয়েছে তাও আবার ৯ শতাংশ সুদ হারে?
(এখানে বলে রাখা ভালো ২৬ লাখ টাকার পেইড আপ ক্যাপিটালের কোম্পানি কিছুদিনের ব্যবধানে ২১ কোটি টাকা আয় করেছে যা ইতিহাস সৃষ্টি করার মত )
যেহেতু এগ্রো অর্গানিকার নিজস্ব কোন সম্পত্তি নেই তাহলে এনআরবি ব্যাংক কিভাবে লোন দিয়েছে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রতিবেদক একজন ব্যাংক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন, ব্যাংক কর্মকর্তা জানান -জমি লিজ নিলেও ব্যাংক লোন পাওয়ার সুযোগ আছে যদি লিজ কর্তৃপক্ষ এন ও সি দেয়।
শেরপুর বিসিক কর্তৃপক্ষ থেকে এগ্রো অর্গানিকা এন ও সি নিয়েছে কিনা জানতে চাইলে শেরপুর বিসিক এর উপ-ব্যবস্থাপক জনাব বিজয় কুমার দত্ত জানান- আমি আসার পর এগ্রো অর্গানিকাকে কোনো এন ও সি দেওয়া হয়নি। আপনি কবে শেরপুর বিসিকে জয়েন করেছেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান -২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর।
অথচ এগ্রো অর্গানিকা ১ ডিসেম্বর ২০২১ সালে এনআরবি ব্যাংক থেকে লোন নিয়েছে ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
প্রতিবেদক এনআরবি ব্যাংকের কোম্পানি সেক্রেটারি মোঃরেজাউল করিম সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি মিটিংয়ে আছে বলে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এনআরবি ব্যাংকের লোন সংক্রান্ত বিষয় জানতে চাইলে এগ্রো অর্গানিকার সিএফও শরীফ আহমেদ জানান - এগ্রো অর্গানিকা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি তাই লোন নিতে এনওসির প্রয়োজন নেই। বিসিক এর আওতায় থাকা কোন সম্পত্তি কেনা যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান - লিজ যিনি নিয়েছেন তার কাছ থেকে আমরা ক্রয় করেছি।
বিসিক এর আওতায় থাকা কোন সম্পত্তি কেউ ক্রয় করতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবারো যোগাযোগ করা হয় শেরপুর বিসিক এর উপ-ব্যবস্থাপক জনাব বিজয় কুমার দত্তের সাথে।তিনি জানান- সরকারি সম্পত্তি ক্রয় করার প্রশ্নই আসে না।এগ্রো অর্গানিকা ২০০৯ সালে বিসিক শেরপুর থেকে জমি লিজ নিয়েছে পার স্কয়ার ফিট ২ টাকা ৫০ পয়সা করে যার মেয়াদ ৯৯ বছর পর্যন্ত ।এগ্রো অর্গানিকা বছরে ২ বার ভাড়া পরিশোধ করে।
জনাব বিজয় কুমার দত্ত আক্ষেপ করে জানান- ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কিংবা শেয়ার মার্কেট কর্তৃপক্ষের উচিত ভালো করে যাচাই-বাছাই করা। তাদের উচিত বিসিকের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যাচাই-বাচাই করে নেওয়া।আমরা আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করব, যা সত্য তাই জানাবো। আমরা চাইনা দেশের সাধারণ জনগণ বিপদে পড়ুক
এ বিষয়ে প্রতিবেদক এগ্রো অর্গানিকার ব্যবস্থাপক পরিচালক মোহাম্মদ আজহার খানের সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার সত্বেও তাকে পাওয়া যায়নি
তবে প্রতিবেদক এগ্রো অর্গানিকার পরিচালক আবু মোহাম্মদ মাহবুবুর করিম মজুমদারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন
তিনি জানান, এগ্রো অর্গানিকার সম্পত্তি আমাদের নিজেদের, তা না হলে এনআরবি ব্যাংক আমাদের কেন লোন দিয়েছে। প্রতিবেদক প্রতি উত্তরে বলেন সরকারি সম্পত্তি কখনো কেনা যায় না কিভাবে লোন নিয়েছেন সেটা আপনারাই ভালো জানেন,শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিকে কিভাবে প্লেসমেন্ট শেয়ার দিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি উত্তেজিত হয়ে বলেন আমি আপনাকে চিনি না,আমি আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই কোন কিছু জানার থাকলে আমাদের অফিসিয়াল ইমেইলে পাঠান।
প্রসপেক্টাস এর তথ্য অনুযায়ী এগ্রো অর্গানিকার কাগজে কলমে কোটি কোটি টাকার রেভিনিউ আর এই রেভিনিউ উৎপাদনের মূল কারণ হলো প্লেসমেন্ট শেয়ার। সুকৌশলে পুঁজিবাজারে আসতে পারলে এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদনহীন এগ্রো অর্গানিকা প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে হয়ে যাবে কয়েকশো কোটি টাকার মালিক।
উল্লেখ্য,এগ্রো অর্গানিকা শেয়ার মার্কেট থেকে কিউআইও’র মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের (কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর) কাছে শেয়ার বিক্রি করে ৫ কোটি টাকা মূলধন উত্তোলন করবে। কোম্পানিটি ৫ কোটি টাকা তুলে কোম্পানিটি কারখানা ভবন সম্প্রসারণ, যন্ত্রপাতি অধিগ্রহণ, কার্যকরী মূলধন এবং ইস্যু ব্যবস্থাপনা খরচ খাতে ব্যয় করবে।
চলবে.........
সম্পাদকীয় : নাহার ম্যানশন (৩য় তলা), ১৫০ মতিঝিল ঢাকা।
ই-মেইল: boishakhinews24.net@gmail.com
হট লাইন: ০১৬৮৮৫০৫৩৫৬
https://www.boishakhinews24.net/