গত ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ঐতিহাসিক অবস্থান কর্মসূচির আগে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের পাতায় একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল— ‘মুসলিম শিক্ষার্থীদের কি এই আন্দোলনে যাওয়া উচিত?’ সোশাল মিডিয়ার বিভিন্ন পোস্টে সতর্ক করে বলা হচ্ছিল, কোনো কারণে আন্দোলন উগ্র রূপ নিলে মুসলিম তরুণরাই বরাবরের মতো বলির পাঁঠা হবেন। এক ফেসবুক পোস্টে সরাসরিই লেখা হয়েছিল, "আব্দুল, দূরে থাকাই ভালো..."।
কিন্তু আন্দোলনের দিন কয়েকের মধ্যেই বদলে গেল দৃশ্যপট। যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মাঝে মুসলিম তরুণ ও স্বেচ্ছাসেবকদের পানি ও খাবার বিতরণের ভিডিও ও ইনস্টাগ্রাম রিলস এখন নেটদুনিয়ায় ভাইরাল।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে এমন কথা জানা গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাদা কুর্তা-পায়জামা ও টুপি পরা এক বয়স্ক মানুষকে তরুণদের খাবার তুলে দিতে দেখে তৈরি একটি ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা হয়— "মুসলিমদের কাউকে কিছু প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তারা সবসময়ই প্রথম সারিতে ছিল এবং থাকবে।"
এর আগে বিভিন্ন আইনি ঝামেলা, পুলিশি হেনস্তা ও বাড়িঘরে বুলডোজার চালানোর ভয়ে অনেক অভিভাবক, মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও প্রবীণ নেতারা আন্দোলন থেকে তরুণদের দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেই ভয় তাদের আন্দোলন থেকে আটকে রাখতে পারেনি; বরং অংশ নেওয়ার কৌশল বদলে দিয়েছে। তারা মাস্ক পড়ে মুখ ঢেকে, ছবি তোলা এড়িয়ে, সামনের সারিতে স্লোগান না দিয়ে খাবার ও পানি বিতরণ, আইনি সহায়তা প্রদান এবং নেপথ্যের লজিস্টিকস সামলানোর মতো ঝুঁকিমুক্ত কাজে নিজেদের যুক্ত রেখেছেন।
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার এক শিক্ষার্থী ব্যানার না ধরে পানি বিতরণ করতে করতে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, "আমি জানি না সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে কি না। তবে ইতিহাস যখন লেখা হবে, তখন যেন না বলা হয় যে বিপদের দিনে আমরা ঘরে বসেছিলাম।"
আন্দোলনে অংশ নেওয়া নয়েডার শিক্ষার্থী ফারাহ মোস্তফা আলাভি বলেন, "মুসলিম হিসেবে, বিশেষ করে একজন মুসলিম নারী হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলার মধ্যে আলাদা মাত্রার ভয় কাজ করে।" জামিয়া ও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের আন্দোলনগুলোর পর মামলার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, তাঁর জানা মতে অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন শিক্ষার্থী মা-বাবার কাছে গোপন রেখে কেবল মাস্ক পরে এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।
প্রবীণদের ভয় কাটিয়ে তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছেন আন্দোলনরত বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতারাও। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে আন্দোলনের ময়দানে নিরলস খাবার সরবরাহ করে যাওয়া মোহাম্মদ জুনায়েদসহ মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকদের প্রকাশ্যে প্রশংসায় ভূষিত করেন। এছাড়া স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশন (এসআইও) এবং জামায়াতে ইসলামী হিন্দের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা যন্তর মন্তরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।
তরুণদের মতে, বর্তমানের ‘জেন-জি’ প্রজন্ম নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের জবাব কীভাবে রাজপথে এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দিতে হয়— তা খুব ভালোভাবেই শিখছে।
সম্পাদকীয় : নাহার ম্যানশন (৩য় তলা), ১৫০ মতিঝিল ঢাকা।
ই-মেইল: boishakhinews24.net@gmail.com
হট লাইন: ০১৬৮৮৫০৫৩৫৬
https://www.boishakhinews24.net/