জিয়া হত্যাকাণ্ড: ৪৫ বছর পর প্রকাশ্যে আসা তদন্ত প্রতিবেদনে যা আছে

রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমানের হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাকে ‘নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার গুরুতর ব্যর্থতার ফল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল সে সময় গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন। তদন্ত কমিশনের সেই প্রতিবেদন দীর্ঘ ৪৫ বছর জনসম্মুখে আসেনি। এতদিন পর সেই প্রতিবেদনের একটি স্বাক্ষরিত কপি হাতে পাওয়ার দাবি করেছে একটি সংবাদমাধ্যম।
১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা।
ওই বছর ৬ জুন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে দেন। সেই কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল ইসলাম।
কমিশনের অপর দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ আফজাল এবং খুলনার জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ সিরাজউদ্দিন আহমেদ। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। তবে সেখানে কী ছিল, তা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
সাড়ে চার দশক পর সেই প্রতিবেদনই প্রকাশ্যে আনার কথা বলছে ডেইলি স্টার। সেখানে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও নিরাপত্তা সদস্য থাকা সত্ত্বেও হামলাকারীরা সেদিন কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়েনি।
জিয়ার অধস্তনদের ‘সন্দেহজনক’ ভূমিকা এবং সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদসহ তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে এসেছে।
তদন্তের পরিধি কেন সীমিত হয়ে যায়
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কমিশনকে শুরুতে হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র ছিল কি না, থাকলে কারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কীভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিশনের কার্যপরিধি সংশোধন করে ওই গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দেয়। ফলে কমিশনের কাজ সীমিত হয়ে যায় রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা, দায়িত্বে অবহেলা এবং হত্যাকাণ্ডের পর প্রশাসনের ভূমিকা মূল্যায়নের মধ্যে।
কমিশন মোট ৬২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়। তাদের মধ্যে তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও ছিলেন।
এল, দেখল, জয় করল
কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, সার্কিট হাউসের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল ছিল যে হামলাকারীরা কার্যত কোনো বাধা ছাড়াই অভিযান শেষ করতে সক্ষম হয়।
ওই রাতে সার্কিট হাউজে ২৬ জন কনস্টেবল, ৬ জন হাবিলদার, একজন সুবেদার এবং রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের একটি চৌকস দল পাহারায় ছিল। তাদের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকে শুরু করে সাবমেশিনগান ও লাইট মেশিনগানের মতো ভারী অস্ত্র ছিল।
কিন্তু বৃষ্টির অজুহাতে প্রহরীরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। সার্কিট হাউজের মূল ফটক সারা রাত খোলা ছিল। আক্রমণকারীদের গাড়ি বিনা বাধায় ভেতরে প্রবেশ করে। পুলিশের গুলিতে আক্রমণকারীদের কেউ আহত পর্যন্ত হয়নি।
কমিশন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, দোতলার সিঁড়িতে কয়েকজন প্রহরী অবস্থান নিলেই এ আক্রমণ ঠেকানো যেত। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ঘরের সামনে বা দোতলায় একজন প্রহরীও ছিল না।
প্রতিবেদনে লাতিন ভাষার বিখ্যাত বাক্য Veni, vidi, vici—অর্থাৎ ‘এলাম, দেখলাম, জয় করলাম’—উদ্ধৃত করে বলা হয়, হামলাকারীদের অভিযান প্রায় সে রকমই সহজ হয়ে গিয়েছিল।
কমিশনের ভাষ্য, সার্কিট হাউসে অস্ত্র বা প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা সদস্যের অভাব ছিল না। কিন্তু বাস্তবে তাদের প্রতিরোধ ছিল অত্যন্ত দুর্বল, যা রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
ব্যক্তিগত স্টাফদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ওই ব্যর্থতার পেছনে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের বড় দায় দেখতে পেয়েছে তদন্ত কমিশন।
কমিশন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৮১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। একই দিনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় মেজর মুজিবুর রহমানেরও।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কমিশনের কাছে এমন তথ্য ছিল, যাতে মনে করার যথেষ্ট কারণ ছিল যে সার্কিট হাউসে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা তার ব্যক্তিগত স্টাফদের একজন বা একাধিক সদস্যের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
হত্যার রাতে মাহফুজুর রহমান রাষ্ট্রপতির কক্ষের পাশের কক্ষে অবস্থান করছিলেন।
রাষ্ট্রপতির এডিসি ক্যাপ্টেন মজহারুল হকের সাক্ষ্য থেকে উদ্ধৃত করে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গুলি থেমে যাওয়ার পর তিনি কক্ষ থেকে বের হয়ে বারান্দায় মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। মাহফুজুর তখন তাকে বলেন, সব শেষ হয়ে গেছে।
তারা গিয়ে দেখেন, রাষ্ট্রপতি রক্তাক্ত অবস্থায় কক্ষের সামনে পড়ে আছেন। কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে তার দেহ ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়েছে এবং মুখমণ্ডলের একটি অংশ বিকৃত হয়ে গেছে।
সেখানে রাষ্ট্রপতির প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এফ এম মঈনুল আহসান এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও পড়ে ছিল।
কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল—একই সময়ে দরজা খুলে বাইরে আসা দুই কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হলেও মাহফুজুর রহমান কীভাবে সম্পূর্ণ অক্ষত থাকলেন।
কমিশন তার কক্ষে পাওয়া গুলির চিহ্ন পরীক্ষা করে পুলিশের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়, ওই গুলির চিহ্ন বাইরে থেকে তৈরি হয়েছে–তেমন সম্ভাবনা খুবই কম। বরং পরে কৃত্রিমভাবে সেগুলো সৃষ্টি করা হয়ে থাকতে পারে–এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কমিশনের সিদ্ধান্ত ছিল, মাহফুজুর রহমান ও ক্যাপ্টেন মজহারুল হক দুজনই হামলাকারীরা চলে যাওয়ার অনেক পরে ওয়্যারলেস অপারেটরের ডাকে কক্ষ থেকে বের হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার সময় তারা দীর্ঘক্ষণ নিজ নিজ কক্ষে টেলিফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত ছিল না এবং এটি তাদের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
পাশের দরজা ব্যবহার করা হয়নি
রাষ্ট্রপতির এডিসি ক্যাপ্টেন মাজহারুল হকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে কমিশন। তার ঘর থেকে রাষ্ট্রপতির ঘরে যাওয়ার একটি সংযোগকারী দরজা ছিল। হামলার সময় সেই পথ দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা যেত, কিন্তু তা করা হয়নি।
ক্যাপ্টেন মজহারুল হক কমিশনকে বলেছেন, তিনি টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন, তবে সংযুক্ত দরজার বিষয়টিই জানতেন না।
কমিশন এই ব্যাখ্যায় বিস্ময় প্রকাশ করে প্রতিবেদনে লিখেছে, রাষ্ট্রপতি যখন আসন্ন বিপদের মুখে ছিলেন, তখন অন্তত দরজায় আঘাত করে তাকে সতর্ক করার চেষ্টা করা উচিত ছিল।
নিরাপত্তা আরও দুর্বল করা হয়েছিল?
কমিশন আরও কয়েকটি বিষয়কে ‘অত্যন্ত সন্দেহজনক’ বলেছে। তদন্তে উঠে আসে, হত্যার দিন সকালে মাহফুজুর রহমান সার্কিট হাউসের কোন কক্ষে কে অবস্থান করছেন, তার টাইপ করা তালিকা সংগ্রহ করেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির আগের সফরগুলোতে তিনি কখনও এমন তালিকা চাননি।
এছাড়া রাত ১০টার দিকে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে মোতায়েন দুই নিরাপত্তা সদস্যকে সরিয়ে নিতে বলেন। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাদের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটতে পারে।
ফলে হত্যাকাণ্ডের সময় রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে কোনো নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন ছিল না।
কমিশন এই ঘটনাগুলোকে ‘অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরেছে।
‘তোমরা কী চাও’: যেভাবে খুন হন জিয়া
৩০ মে রাত ৩টা ৪৫ মিনিটে সার্কিট হাউজে কমান্ডো স্টাইলে হামলা হয়। আক্রমণকারীরা পর পর দুটি রকেট লঞ্চার ও কয়েকটি গ্রেনেড ছোড়ে। রকেটগুলো জিয়াউর রহমানের ঠিক নিচের তলার ঘরে আঘাত হানে। এরপর শুরু হয় মুহুর্মুহু গুলি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, “রাষ্ট্রপতি তার ঘরের পূর্ব দিকের দরজা খুলে বাইরে এসে বলেন, তোমরা কী চাও?’ এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা স্টেনগান দিয়ে তার ওপর ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন রাষ্ট্রপতি।
প্রতিবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে কমিশন বলেছে, জিয়াউর রহমানের দেহে মোট ২০টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়।
মুখমণ্ডল ও গলায় কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল। নিচের চোয়াল ভেঙে যায় এবং ঘাড়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।
এ ছাড়া বুক, পেট, ডান হাত ও শরীরের বিভিন্ন অংশে একাধিক গুলির চিহ্ন ছিল।
হত্যার পর ৩০ মে সকাল পর্যন্ত তার মরদেহ সার্কিট হাউসের কক্ষের সামনে পড়ে ছিল।
কীভাবে হারিয়ে গেল রাষ্ট্রপতির মরদেহ
তদন্ত কমিশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধান ছিল হত্যার পর জিয়ার মরদেহ কীভাবে সার্কিট হাউস থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং কেন রাষ্ট্রের কোনো সংস্থা তা রক্ষা করতে পারেনি।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করার পর মাত্র দুজন এনএসআই কর্মকর্তাকে মরদেহ পাহারার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল। তাদের ধারণা হয়েছিল, সেনাবাহিনীর একটি অংশ বিদ্রোহ করেছে এবং চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে গেছে। ফলে তারা নিজেদের উদ্যোগে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সাহস পাননি।
সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুটি সেনা জিপ ও ভারী অস্ত্রসজ্জিত একটি সামরিক বাহন সার্কিট হাউসে আসে।
তিনজন মেজর ও ১০ থেকে ১৫ জন সেনাসদস্য সেখানে প্রবেশ করে। তারা অস্ত্রের মুখে এনএসআই কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং রাষ্ট্রপতির কক্ষসহ অন্যান্য কক্ষ তল্লাশি শুরু করে। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি স্যুটকেসে ভরে নেওয়া হয়।
এরপর সাদা চাদরে জড়িয়ে জিয়াউর রহমানের মরদেহ নিচে নামানো হয়। একইভাবে প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এফ এম মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহও একটি সামরিক ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
সবকিছু সারতে তাদের প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। দুপুরের দিকে আরেকটি সামরিক দল এসে রাষ্ট্রপতির স্যুটকেসও নিয়ে যায়। কমিশন বলেছে, মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের কেউ জানতেন না সেটি কোথায় নেওয়া হয়েছে কিংবা কোথায় দাফন করা হয়েছে।
১ জুন বিদ্রোহ দমনের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ উদ্ধারের অভিযান শুরু হয়।
একটি সূত্রের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা রাঙ্গুনিয়া উপজেলার কাপ্তাই সড়কের পাশে পাহাড়ের ঢালে পাথরঘাটা গ্রামে একটি কবর শনাক্ত করেন।
সেখানে একটি গণকবর থেকে জিয়াউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মঈনুল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খানের মরদেহ উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়।
কেন মরদেহ রক্ষা করা গেল না
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কমিশন তৎকালীন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যার পর ঢাকা থেকে মরদেহ সুরক্ষার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, উপস্থিত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউই মরদেহ রক্ষায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেননি।
তখনকার সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ কমিশনকে বলেছিলেন, বিদ্রোহ দমন না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ উদ্ধার করাকে তিনি অগ্রাধিকার দেননি।
নৌবাহিনী প্রধান মাহবুব আলী খান বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব তার কাছে কোনো সহায়তা চাননি। ওই সময়ে নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোকে নিরাপদ অবস্থানে নেওয়াই তার প্রধান দায়িত্ব ছিল।
সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মহিবুল হাসান কমিশনকে বলেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সচিব মাহফুজুর রহমানকে দ্রুত ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে স্থানীয় সেনাবাহিনীর আচরণ দেখে তার মনে হয়েছিল, সেনাবাহিনীর একটি অংশই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এ কারণে তিনি এবং উপ প্রধানমন্ত্রী বদরুদ্দোজা চৌধুরী সার্কিট হাউস ত্যাগ করেন।
বিদ্যুৎ ও পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী এল কে সিদ্দিকীও কমিশনকে বলেন, মাহফুজুর রহমান তাকে বলেছিলেন, ঢাকাকে সব জানানো হয়েছে এবং নিরাপত্তার কারণে তাকে সরে যেতে বলা হয়েছে।
তথ্যমন্ত্রী শামসুল হুদা চৌধুরী বলেন, ঢাকায় মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান কমিশনকে বলেন, স্থানীয় কর্মকর্তারা চাইলে মরদেহ কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারতেন।
কমিশন এই মন্তব্যকে ‘হাস্যকর’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রশ্ন তোলে—জাতীয় সংকটের মধ্যে স্থানীয় কর্মকর্তারা বাস্তবে কোথায় এবং কীভাবে রাষ্ট্রপতির মরদেহ লুকিয়ে রাখতেন?
কমিশনের মতে, ৩০ মে সকাল থেকে ১ জুন ভোর পর্যন্ত কার্যত চট্টগ্রাম ছিল বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ন্ত্রণে।
রেডিও, টেলিযোগাযোগ, বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষে রাষ্ট্রপতির মরদেহ উদ্ধার বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না।
বরং ঢাকার কোনো নির্দেশনা না পাওয়ায় তারা অপেক্ষা করার নীতি গ্রহণ করে।
ওই পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন বা পুলিশকে দায়ী করার মত কোনো প্রমাণ কমিশন পায়নি।
গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতাই ছিল ‘মূল কারণ’
কমিশনের চূড়ান্ত মূল্যায়নে বলা হয়, হত্যাকারীরা যে সফল হতে পেরেছিল, তার বড় কারণ ছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যর্থতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে যে ষড়যন্ত্র গড়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে আগে থেকেই তথ্য থাকা সত্ত্বেও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কর্মকর্তারা কমিশনকে বলেছেন, তারা মঞ্জুরের ‘বিদ্রোহী মনোভাব’ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে একাধিকবার সতর্ক করেছিলেন।
তবে কমিশনের মতে, চট্টগ্রামে দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক হামলার সময়, পরিকল্পনা কিংবা সেনা সদস্যদের অস্বাভাবিক তৎপরতা সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হয়।
কমিশনের তদন্তে দেখা যায়, সার্কিট হাউসে সেদিন বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য মোতায়েন ছিল।
পুলিশ সদস্যদের কাছে রাইফেল, সাবমেশিনগানসহ প্রয়োজনীয় অস্ত্র ছিল। প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রপতির কক্ষের সামনে কোনো নিরাপত্তা সদস্য ছিলেন না।
হামলার রাতে প্রধান ফটক খোলা ছিল। বৃষ্টির কারণে অনেক নিরাপত্তা সদস্য দায়িত্বস্থল ছেড়ে নিচতলায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। এমনকি গভীর রাতে একটি ব্যক্তিগত গাড়িও কোনো তল্লাশি ছাড়াই সার্কিট হাউসে ঢুকে যায়।
কমিশনের মনে করেছে, কয়েকজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নিরাপত্তা সদস্য সিঁড়িতে অবস্থান নিলেই হামলাকারীদের ওপরের তলায় উঠতে বাধা দেওয়া সম্ভব ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র ১৪ থেকে ১৬ জন হামলাকারী এই অভিযানে অংশ নিয়েছিল। অথচ পর্যাপ্ত অস্ত্র, প্রশিক্ষিত সদস্য এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থাকার পরও রাষ্ট্রপতিকে রক্ষা করার মতো কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।
কমিশনের উপসংহার হল, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ এবং প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্ট—রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সব সংস্থাই বিভিন্ন মাত্রায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। আর সেই ব্যর্থতার পরিণতিই ছিল ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।
বন্ধু থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে যে বিদ্রোহী প্রশাসন গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মুহাম্মদ আবুল মঞ্জুর।
যদিও কমিশনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যে মঞ্জুরের মৃত্যুর তদন্ত ছিল না, তবু ৬২ জন সাক্ষীর জবানবন্দি এবং সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে তার ভূমিকা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্রতিবেদনে আলাদা অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান ও আবুল মঞ্জুর ছিলেন ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা। দুজনই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর হিসেবে যুদ্ধ শুরু করেন এবং স্বাধীনতার পরও তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
কমিশনের ভাষ্য, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মঞ্জুরের সম্পর্ক ক্রমেই তিক্ত হয়ে ওঠে। তিনি রাষ্ট্রপতির প্রতি অসন্তোষ পোষণ করতে শুরু করেন এবং অন্য সামরিক কর্মকর্তাদের সামনেও অসম্মানজনক আচরণ করতেন, যা সামরিক শৃঙ্খলার পরিপন্থি ছিল।
সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে কমিশন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে, রাষ্ট্রপতির চট্টগ্রাম সফরের খবর পাওয়ার পরই মঞ্জুর ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচ দিন আগে, ১৯৮১ সালের ২৫ মে, মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের কমান্ড্যান্ট হিসেবে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সেনাশক্তির দায়িত্বে থাকা একজন জেনারেলের কাছে এই বদলি ‘মর্যাদাহানিকর’ বলে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল।
কমিশনের ভাষায়, মঞ্জুর হয়ত মনে করেছিলেন, তার রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি প্রথম আঘাত হেনেছেন এবং তার জবাব দেওয়ার সময় এসে গেছে।
আগে থেকেই ছিল অসন্তোষ
ডিজিএফআইয়ের চট্টগ্রাম ডিটাচমেন্টের তৎকালীন কমান্ডিং কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু লায়েস চৌধুরীর সাক্ষ্য উদ্ধৃত করে কমিশন বলেছে, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি থেকেই একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তার মধ্যে সরকারের প্রতি অসন্তোষ দেখা দেয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মঞ্জুর ধীরে ধীরে নিজের মতাদর্শের কর্মকর্তাদের চট্টগ্রামে বদলি করিয়ে আনছিলেন।
তিনি নিয়মিতভাবে এই প্রবণতার বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মঞ্জুর ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের ক্যান্টনমেন্টে অবাধ প্রবেশও সীমিত করে দেন, ফলে গোয়েন্দা কার্যক্রম কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
হত্যার পর বিদ্রোহী সরকারের ঘোষণা
রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পরপরই ঘটনাকেন্দ্র হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম সেনানিবাস।
কমিশনের ভাষ্য, ৩০ মে ভোর থেকেই মঞ্জুর নিজ কার্যালয়ে বসে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, নির্দেশনা দেওয়া এবং বিভিন্ন নোট লিখতে থাকেন। তার আচরণে স্পষ্ট ছিল যে তিনিই পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সেদিন সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ বেতার চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়, ‘আর্মি রেভল্যুশনারি কাউন্সিল’ রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছে এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছেন।
যদিও ঘোষণায় কাউন্সিলের সদস্যদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। পরে বিভাগীয় কমিশনার, উপ-কমিশনারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সেনানিবাসে ডেকে পাঠানো হয়।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে মঞ্জুর সবাইকে তার নির্দেশ মেনে চলার নির্দেশ দেন এবং উপস্থিত কর্মকর্তাদের কোরআন স্পর্শ করিয়ে বিদ্রোহের প্রতি আনুগত্যের শপথ করান।
পরদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সরকারি দপ্তর, বন্দর, ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মঞ্জুর।
সেখানে তিনি ঢাকা বেতারের সংবাদ না শোনার নির্দেশ দেন এবং দাবি করেন, ঢাকাকে শেষ পর্যন্ত তার শর্ত মেনে নিতে হবে।
তিনি বন্দর দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা, ঢাকায় জ্বালানি না পাঠানো এবং চট্টগ্রাম বেতারকে ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচার চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
দ্রুত ভেঙে পড়ে বিদ্রোহ
কমিশনের তদন্তে উঠে আসে, রাষ্ট্রপতি হত্যার পরবর্তী পরিকল্পনা বিদ্রোহীদের মধ্যে ছিল অত্যন্ত দুর্বল।
৩১ মে রাত থেকেই সেনা সদর দপ্তরের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা শুরু হয়।
ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহ কমিশনকে জানান, তিনি বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু সেনা সদর দপ্তর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া অন্য কোনো প্রস্তাব গ্রহণে রাজি হয়নি।
কমিশনের ভাষায়, বিদ্রোহীদের পুরো পরিকল্পনাই ছিল অপরিণত, অপরিকল্পিত এবং অপেশাদার। রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পর কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখা হবে—সে বিষয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না।
পাহাড়ে পালিয়ে আত্মসমর্পণ, তারপর মৃত্যু
১ জুন গভীর রাতে মঞ্জুর, তার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পাহাড়ি এলাকায় পালিয়ে যান।
একপর্যায়ে গাড়ি ফেলে তারা পায়ে হেঁটে এগিয়ে যান।
পুলিশ, এনএসআই ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ অভিযানে পরে ফটিকছড়ি এলাকার এশিয়া টি গার্ডেনের কাছে এক শ্রমিকের বাড়িতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ ঘেরাও করলে মঞ্জুর একটি চীনা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল হাতে নিয়ে বেরিয়ে আসেন।
তবে তিনি কোনো প্রতিরোধ না করে অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করেন। তাকে, তার স্ত্রী-সন্তানসহ অন্যদের আটক করে প্রথমে থানায় নেওয়া হয়।
পরে সেনাবাহিনীর একটি দল এসে মঞ্জুরকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার অনুরোধ জানায়।
পুলিশ কর্মকর্তারা ঢাকার অনুমতি নেওয়ার পর তাকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেন।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, হস্তান্তরের সময় মঞ্জুর আপত্তি জানিয়ে বলেন, তিনি আর সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা নন; তাই তাকে বেসামরিক প্রশাসনের হেফাজতেই রাখা উচিত।
তবে সেনা সদর দপ্তরের নির্দেশের কথা জানিয়ে তাকে সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া হয়।
কমিশনের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাকে দড়ি দিয়ে হাত-পা বেঁধে চোখ কাপড়ে ঢেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা কমিশনকে বলেন, মঞ্জুরকে নিয়ে যাওয়ার পথে কিছু সশস্ত্র সেনাসদস্য তাদের গাড়ি থামিয়ে তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তিনি আপত্তি জানালেও তাকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়।
পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে অন্য কর্মকর্তারা মঞ্জুরের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের তৎকালীন কমান্ডিং কর্মকর্তার সাক্ষ্য অনুযায়ী, তার মাথার পেছনে বড় ধরনের গুলির ক্ষত ছিল। ময়নাতদন্তেও সেটিকে ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা’ বলা হয়েছে। এরপর তাকে চট্টগ্রাম সেনা কবরস্থানে দাফন করা হয়।
কমিশনের চূড়ান্ত মূল্যায়ন
তদন্ত প্রতিবেদনে উপসংহারে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড ছিল নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থার বহুমাত্রিক ব্যর্থতার ফল।
কমিশনের মতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মঞ্জুরের বিদ্রোহী তৎপরতার বিষয়ে আগে থেকেই বিভিন্ন তথ্য পেলেও তা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ, প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে গুরুতর ঘাটতি ছিল।
পর্যাপ্ত অস্ত্র, প্রশিক্ষিত নিরাপত্তা সদস্য এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে মাত্র ১৪ থেকে ১৬ জন হামলাকারীর একটি দল সার্কিট হাউসে ঢুকে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করে এবং কার্যত কোনো উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ ছাড়াই সেখান থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
প্রতিবেদনটি ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সরকারের কাছে জমা দেওয়া হলেও তা আর কখনও প্রকাশ করা হয়নি। সূত্র: বিডি নিউজ










