যারা জনরায় মানে না তারা জনগণের সরকার হতে পারে না : জামায়াত আমির

জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান এমপি বলেছেন, ‘যে সরকার জনগণের রায় মানে না, সে সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না।’
কুখ্যাত ব্যাংক ডাকাতদের গাড়িতে করে রিসিপশন নেয়া ব্যক্তিরা জনগণকে কিছু দিতে পারে না বলেও এসময় মন্তব্য করেন তিনি। সেইসাথে পাশে ভালো মানুষ রাখতে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেন তিনি।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
শনিবার (১৩ জুন) বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন মেকানিজমে সরকারে গিয়ে এখন বলছেন ৫১ ভাগ মানুষ আপনাদেরকে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিয়েছে। ভালো কথা, কিন্তু ৭০ ভাগ মানুষ যে ভোট দিয়ে বলেছে- জনগণের গণরায় মানতে হবে, সেটা মানছেন না কেন? ৫১ ভাগ বুঝলেন, ৭০ ভাগ বুঝতে পারলেন না?’
প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ভালো মানুষ পাশে রাখুন, যাদের অন্তরে দেশপ্রেম আছে, মানবতাবোধ আছে, চরিত্র উন্নত, যারা চাঁদাবাজদের চাঁদাবাজির ভাগিদার নয়, তাদেরকে বসান। একজন কুখ্যাত ব্যাংক ডাকাত, তার গাড়িতে করে যারা রিসিপশন নেয় তাদের দ্বারা আপনার সরকার জনগণকে কিছু দিতে পারবে না।’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘আমার কষ্ট লাগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্য। তার আশেপাশে উনি কাদেরকে বসিয়েছেন। উনি কুমিল্লায় এসে ইপিজেড দেন, ফরিদপুরে গিয়ে সয়াবিন তেল দেন, সংসদে গিয়ে প্রাথমিক বিশ্ববিদ্যালয় উপহার দেন। আর কক্সবাজারে এসে বলেছেন এই বাজেটে মাদক ও ধূমপান জাতীয় দ্রব্যের ট্যাক্স বাড়ানো হয়েছে বলে বিরোধী দল তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে মিছিল করেছে। যা মিথ্যা, ভুয়া। বিরোধীদলের কেউ এটা করে নাই।’
‘আমার করুণা লাগে প্রধানমন্ত্রীর এই পদ রাষ্ট্রীয় পদ, তিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী। তার দিকে তাকিয়ে বিশ্বের জনগণ বাংলাদেশকে মূল্যায়ন করে। তার মুখ দিয়ে ওই সমস্ত ভুল কথা বের হতে থাকলে বাংলাদেশ লজ্জিত হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এদেরকে চিহ্নিত করুন, যারা আপনাদেরকে ভুল বলাচ্ছে। আপনার সম্মান মানে বাংলাদেশের সম্মান, এদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিন। নইলে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু আপনি হবেন না, গোটা জাতিকেই আপনি ক্ষতিগ্রস্ত করবেন,’ বলেন তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, ‘বাজেট নিয়ে বিরোধীদল প্রতিক্রিয়া জানাবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। এটা গণতন্ত্রের নির্যাস, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য্য, এতে রাগ করার কি আছে, অল্পতে ধৈর্য্য হারালে ১৮ কোটি মানুষের দায়িত্ব পালন করবেন কিভাবে? জনগণ সমর্থন দেবে, প্রশংসা করবে, জনগণ যখন দেখবে জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আপনার সরকার আন্তরিক। কিন্তু জনগণ যখন দেখবে ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে আপনার অপমান বা অগ্রাহ্য করছেন, তখন জনগণ বসে বসে আঙ্গুল চুষবে না। রায় দিয়েছে জনগণ, মানতে হবে সরকারকে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম জনগনের সকল সমস্যার সমাধান সংসদে হোক, সরকার চায়নি, আমাদেরকে তারা ঠেলে দিয়েছে জনগণের কাতারে। যদি গণভোটের রায় মেনে নেয়া হতো, আজকের বিভাগীয় সমাবেশের প্রয়োজন হতো না। একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সীমান্তে কি হচ্ছে, না হচ্ছে এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য আমরা সংসদে নোটিশ দিয়েছি, আমাদের নোটিশকে নিয়ে টালবাহনা করা হচ্ছে।’
তিনি প্রশ্ন রাখেন— ‘কারে খুশি করতে চান? কারে খুশি করে দেশ পরিচালনা করতে চান? যদি বাংলাদেশের সরকার হয়ে দেশ পরিচালনা করে থাকেন, তাহলে এই ধরনের ইস্যু সংসদে আলোচনা করতে দিতে হবে। আমরা সংসদে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য আলোচনা করবো না, আমরা আলোচনা করবো বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বকে সুসংহত করার জন্য। কিন্তু আমাদেরকে সেই সুযোগ থেকে যদি বঞ্চিত রাখা হয়, মনে রাখবেন জাতির সাথে গাদ্দারি করে কেউ পার পাবে না ইনশাআল্লাহ। আমি কথা দিচ্ছি জাতির সাথে আমরা গাদ্দারি করবো না। জীবনের বিনিময়ে হলেও আমাদের দেয়া কথা রক্ষা করবো।’
তিনি বলেন, ‘দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী। জনগণ তাদের ভোটাধিকার ও গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন দেখতে চায়। সরকার যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণই তার জবাব দেবে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে যোগ্য, সৎ ও দেশপ্রেমিক লোকদের মূল্যায়ন না করে ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন এবং দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। সংসদে জনগণের সমস্যা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গেলেও নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ সংসদ জনগণের কথা বলার জায়গা।’
ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা বিদেশী শক্তির কাছে ইজারা দেয়া হবে না। দেশের ১৮ কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই দেশকে রক্ষা করবে। আমরা জাতির সাথে বেঈমানি করবো না; জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতেও প্রস্তুত আছি।’
তিনি বলেন, ‘জনগণ আশা করেছিল নির্বাচিত সরকার আসলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে, বাংলাদেশের কোনো জায়গায় চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। দেশে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। নির্বাচিত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এসব অপসংস্কৃতির অবসান ঘটবে। জনগণের ন্যায্য অধিকার আদায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের সংগ্রাম চলবে সংসদেও, রাজপথেও। ভয়ভীতি, মামলা-হামলা কিংবা কারাবাসের হুমকি দিয়ে জনগণের আন্দোলন দমিয়ে রাখা যাবে না।’
















