যেখানে বরফও রোদে হাসে: মাইনউদ্দিন আহমেদ

প্রচণ্ড শীতকে উপেক্ষা করে কণ্যা, জামাতা ও আমি বেরিয়ে পড়লাম দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের ইসের Isère বিভাগের গ্রেনোবলের কাছাকাছি বেলেডোন Belledonne পর্বতমালায় অবস্থিত বিখ্যাত স্কি রিসোর্ট সামরোজ Chamrousse অভিমুখে। লক্ষ্য একটাই নিজে স্কিইং না করলেও বরফে মোড়া পাহাড়ে হাজারো স্কিয়ারদের দুরন্ত ছুটে চলা দেখা এবং প্রকৃতির সেই অনন্য রূপ উপভোগ করা।
শীত মৌসুমে, বিশেষ করে যখন পর্বতমালাগুলো শুভ্র বরফে আচ্ছাদিত থাকে, তখন ফ্রান্সে আগত পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে সামরোজ। স্কিইংপ্রেমীদের কাছে এটি যেন এক স্বপ্নের নাম। একাধিক সুউচ্চ পর্বতের সমাহারে গড়ে ওঠা এই রিসোর্টে উল্লেখযোগ্য দুটি পর্বতশৃঙ্গ হলো রেকোয়েন Recoin যার উচ্চতা সামরোজের সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৫৪১২ ফুট এবং রোশে বেরেঞ্জার Roche Béranger যার উচ্চতা প্রায় ৫৭৪০ ফুট। এই পাহাড়শৃঙ্গগুলো থেকেই স্কিয়াররা শুরু করে তাদের রোমাঞ্চকর অবতরণ।
সামরোজ মূলত তিনটি গ্রাম নিয়ে গঠিত সামরোজ ১৬৫০, সামরোজ ১৭০০ এবং সামরোজ ১৭৫০। স্কি এলাকাটি বিস্তৃত প্রায় ৪৫০০ ফুট থেকে ৭৫০০ ফুট উচ্চতা পর্যন্ত। এখানে রয়েছে মোট ৪৩টি রান, প্রায় ৯০ কিলোমিটার দীর্ঘ স্কি পিস্ট, যেখানে স্কিয়াররা অবিরাম ছুটে চলে। পাশাপাশি রয়েছে সানসেট পার্ক, যেখানে জাম্প ও বর্ডারক্রস ট্র্যাকের মতো আকর্ষণ, আর স্কি ছাড়াও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আছে ৩৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ক্রস-কান্ট্রি ট্রেইল।
ভোরবেলায় লিয়ন থেকে যাত্রা শুরু করি। তখন তাপমাত্রা ছিল শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেড় ঘণ্টার বাসযাত্রায় পৌঁছাই গ্রেনোবলে, সেখান থেকে বাস বদলে আবার সামরোজের পথে। পথ যত উঁচুতে উঠছিল, প্রকৃতির রূপ ততই বদলে যাচ্ছিল। প্রায় ৪০০০ ফুট পর্যন্ত চারপাশ ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রাও শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু সামরোজের কাছাকাছি আসতেই যেন দৃশ্যপট বদলে গেল রোদ উঁকি দিতে শুরু করলো।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত সামরোজে পৌঁছে দেখি ঝকঝকে রোদেলা এক দিন। তাপমাত্রা তখন প্রায় ছয় ডিগ্রি। বরফে সূর্যের আলো পড়ে এমন তীব্র প্রতিফলন সৃষ্টি করছিল যে প্রথমে চোখ খানিকটা ঝলসে উঠলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেটি সহনীয় হয়ে যায়। চারদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন সাদা আর নীলের ক্যানভাসে নিজ হাতে ছবি এঁকেছে।
আমরা তিনজনও হাজারো পর্যটক ও স্কিয়ারদের সঙ্গে কেবল কারে উঠে পড়লাম প্রায় ৬০০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের শৃঙ্গে। ওপরে উঠে একদিকে চোখে পড়ছিল বরফে ঢাকা বিস্তীর্ণ পর্বতমালা, অন্যদিকে অনেক নিচে প্রকৃতির স্তব্ধ সৌন্দর্য। তার মাঝখানে অগণিত স্কিয়ার কেউ দ্রুতগতিতে, কেউ ধীরে নিজ নিজ ছন্দে নেমে যাচ্ছে পাহাড় বেয়ে। সেই দৃশ্য শুধু দেখা নয়, অনুভব করার মতো।
এই ভ্রমণ ছিল আনন্দ, কৃতজ্ঞতা আর বিস্ময়ের এক অপূর্ব সমন্বয়। কণ্যার এমন সুন্দর আয়োজনের জন্য তাকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। আর সর্বোপরি মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি তাঁর কৃপায় তাঁর সৃষ্টির এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।










