আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার মিয়ানমারের

আপডেট: January 17, 2026 |
inbound1839844083979828868
print news

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) আত্মপক্ষ সমর্থনের শুরুতেই রাখাইনের সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিয়ানমার।

তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ক্ষেত্রে গাম্বিয়া পর্যাপ্ত প্রমাণও হাজির করতে পারেনি বলে শুক্রবার তারা দাবি করেছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।

এদিনের শুনানিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং আইসিজের বিচারকদের বলেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন’।

গত সপ্তাহে গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাওদা জেলো আদালতকে বলেছিলেন, মিয়ানমার তার ‘গণহত্যামূলক নীতিকে’ কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর নির্মম আক্রমণ চালায়। এই আক্রমণের মুখে অন্তত ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয় আর তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গারা নির্বিচার হত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের শিকার হওয়ার ঘটনা তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন তদন্ত শেষে সিদ্ধান্তে আসে, ২০১৭ সালে হওয়া ওই সামরিক হামলার সময় ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। তারা দাবি করে, মুসলিম জঙ্গিদের হামলার প্রতিক্রিয়ায় তাদের সামরিক আক্রমণ ছিল একটি বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।

২০১৯ সালে আইসিজেতে এই মামলার প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমারের তৎকালীন নেতা অং সান সু চি গাম্বিয়ার গণহত্যার অভিযোগগুলোকে ‘অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর’ অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

শুক্রবার হ্লাইং আইসিজেকে বলেন, “মিয়ানমার নিস্ক্রিয় বসে থাকতে ও সন্ত্রাসীদের উত্তরাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে অবাধে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিতে পারে না।

“সেসব (সন্ত্রাসী) হামলার কারণেই সেখানে অভিযান চালাতে হয়, যাকে সামরিক পরিভাষায় বিদ্রোহ-দমন বা সন্ত্রাস-দমন অভিযান বলা যেতে পারে।”

গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলাটি করে ২০১৯ সালে; সামরিক সরকারের অধীনে থাকার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ‘দায়বদ্ধতার বোধ’ থেকেই মামলাটি করা হয়েছে বলে জেলো আদালতকে বলেছেন।

সোমবার গাম্বিয়ার এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘রোহিঙ্গারা বহু দশক ধরে ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করেছে এবং বছরের পর বছর অবমাননাকর প্রচারের শিকার হয়েছে, এর ধারাবাহিকতায় আসে সামরিক অভিযান।’

“ধারাবাহিক গণহত্যামূলক নীতি নেওয়াই হয়েছিল মিয়ানমার থেকে তাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে,” অভিযোগ তার।

নারী-শিশু ও বয়স্কদের হত্যা, পাশাপাশি তাদের গ্রামগুলোকে ধ্বংস করা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম বলা যায় না, বলেছেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম আফ্রিকান দেশটির আইনজীবীরা।

“সব প্রমাণ একত্রে বিবেচনায় নিলে, আদালত কেবল এই যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্তেই পৌঁছাতে পারে যে মিয়ানমার জেনে-বুঝে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল তাদেরকে নির্মূল করা,” গাম্বিয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে বলেছেন ফিলিপ স্যান্ডস।

এ মামলায় গাম্বিয়া ৫৭ মুসলিম দেশের জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনেরও (ওআইসি) সমর্থন পেয়েছে।

মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি হ্লাইং শুক্রবার বলেছেন, ‘রাখাইন রাজ্যের যারা এখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আছে, তাদের ফেরাতে মিয়ানমার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু কোভিড-১৯ এর মতো বাইরের অনেক কিছু এতে বাধ সেধেছে।’

“২০১৭ সাল থেকে এ বিষয়ে মিয়ানমারের প্রতিশ্রুতি ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা গাম্বিয়ার এ বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা হচ্ছে- মিয়ানমারের উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস বা দেশত্যাগে বাধ্য করা,” আদালতকে বলেছেন হ্লাইং।

তিনি আরও বলেন, “গণহত্যা প্রমাণিত হলে তা আমার দেশ ও এর জনগণের গায়ে এক অমোচনীয় কালি লাগিয়ে দেবে, সে কারণেই এ সংক্রান্ত রায় আমার দেশের সুনাম ও ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাসহ প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা শোনার জন্য আদালত তিন দিন সময়ও রেখেছে, তবে এই অধিবেশনগুলোতে সাধারণ লোকজন ও গণমাধ্যম ঢুকতে পারবে না।

এ বছরের শেষ নাগাদ মামলার চূড়ান্ত রায় আসতে পারে বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে।

এই মামলার রায় গাজা যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হওয়া গণহত্যার মামলাতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর