ঘুষ না পেয়ে নামজারি বাতিল, সেবা গ্রহীতাকে হুমকি, তহশিলদারের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ

আপডেট: January 27, 2026 |
inbound2009137416769932977
print news

জাহাঙ্গীর আলম, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: ঠাকুরগাঁওয়ের সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন, জমির নামজারি আবেদন ইচ্ছাকৃতভাবে বাতিল এবং অর্থের বিনিময়ে সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের সিঙ্গিয়া কলোনিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও আয়াতুল্লা দেওয়ানীর ছেলে নুরে আলম সুজন (৩৮) ।

অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করায় এক ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযুক্ত তহশিলদারের বিরুদ্ধে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে।

inbound1383427581407890442

জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা কাজিমা আক্তার তার ভোগদখলে থাকা জমির নামজারির জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে আবেদন করেন।

আবেদন তদন্ত শেষে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশিলদার) আবুল কালাম আজাদ প্রথমে দাবি করেন, জমিটি আবেদনকারীর দখলে নেই। তবে একইসঙ্গে নামজারি প্রতিবেদন মঞ্জুর করে দেওয়ার শর্তে তিনি ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ দাবির প্রমাণ হিসেবে একটি চিরকুটের মাধ্যমে তিনি তার ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বর ভুক্তভোগীর হাতে দেন।

তহশিলদারের দেওয়া বিকাশ নম্বরে ভুক্তভোগী কাজিমা আক্তার প্রথম দফায় ২০ হাজার টাকা পাঠান।
এরপর বাকি ৩০ হাজার টাকা তহশিলদারের একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী মাজেদুলের মাধ্যমে দাবি করা হয়।

কিন্তু বাকি টাকা দিতে ভুক্তভোগী অস্বীকৃতি জানালে তহশিলদার আবুল কালাম আজাদ “দখল নাই” উল্লেখ করে একটি মিথ্যা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন এবং নামজারির আবেদন বাতিল করে দেন।

নামজারি আবেদন বাতিলের কারণ জানতে ভুক্তভোগী ভূমি অফিসে গেলে তহশিলদার নানাভাবে টালবাহানা শুরু করেন এবং ধারাবাহিক হয়রানি চালাতে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

inbound2607388850434974169

পরবর্তীতে নামজারি বাতিলের ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ভুক্তভোগী কাজিমা আক্তার জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তহশিলদারের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক তদন্তের নির্দেশ দিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কে দায়িত্ব দিলে তহশিলদার আবুল কালাম আজাদ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরপর তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের ওপর অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়।

এ অবস্থায় ভুক্তভোগী কাজিমা আক্তারের ছেলে নুরে আলম সুজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ভুল্লী থানায় অভিযুক্ত তহশিলদার আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন।

জিডিতে সুজন উল্লেখ করেন, তার নাবালক ভাই মাহমুদুলের পক্ষে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের করায় তহশিলদার ও তার সহযোগীরা বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের পরিবারকে হুমকি দিয়ে আসছে।

নুরে আলম সুজন অভিযোগ করে বলেন, তিনি ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

ঘুষ না পাওয়ায় তহশিলদার মিথ্যা প্রতিবেদন দিয়ে নামজারি বাতিল করেছেন এবং দুর্নীতির অভিযোগ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে সহযোগীদের মাধ্যমে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন।

ব্যক্তিগত ফোনে বারবার কল ও বাজারে এসে প্রকাশ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। অভিযুক্ত তহশিলদারকে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় না আনলে যে কোনো সময় বড় ধরনের অঘটন ঘটতে পারে।

মাহামুদুল অভিযোগ করে বলেন, আমি কয়েক দিন আগে ভূমি অফিসে যায়। যাওয়ার পরে আমি ওনাকে আবেদনের কথা বললে তিনি আমার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন ছোট একটি কাগজের পেন্সিলের লিখে।

পরে আমি ২০ হাজার টাকা দিতে চাইলে বিকাশ নাম্বারে পাঠিয়ে দিতে বলেন। পরে আমি তার বিকাশ নাম্বারে টাকাটা পাঠিয়ে দেয়।

পরে আরও ৩০ হাজার টাকার জন্য মাজেদুলকে পাঠান আমার কাছে। বাকি টাকা না দিলে তিনি আমার কাজ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন।

রুবেল হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, আমার দাদার ক্রয়কৃত প্রায় সাড়ে ৩ এককর জমি খাজনা দেয়ার জন্য ভূমি অফিসে যায়।

প্রথমে তহশিলদার ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে আমি ওনাকে কিছু কমাতে বললে তিনি ৪০ হাজার টাকা নিয়ে খাজনাগুলো কমায় দেয়। ২৫০০ টাকার রশিদ হাতে ধরিয়ে দেয় আমার।

আরেক ভুক্তভোগী ইসমাইল হোসেন বলেন, আমার জমির কাগজপত্র সব ঠিক থাকার সত্যেও তহশিলদার বাতিল করে দেন।

আমি কয়েকবার তার কাছে গেলে তিনি আমায় বলে যে এসিল্যান্ড স্যার নাকি আমার আবেদনটি বাতিল করে দিছে। আজও আমার জমির খারিজ হয়নি। অনেক হয়রানীর শিকার হয়েছি।

এরা মানুষকে মানুষ মনে করে না। শুনেছি তারা টাকা ছাড়া কোন কাজ করে না। তহশিলদার সরেজমিনে না গিয়ে তার বিশেষ সহযোগিতাদের মাঠে পাঠন এবং খোজখবর নেন।

তার সহযোগীদের খুশি করালে কাজ হয় আর না করালে কাজ আর হয় না। আমরা কবে এই ঘুষখোরদের হাত থেকে মুক্তি পাবো? এসিল্যান্ড অফিসে গেলে সেখানেও বাধা। পিয়নদের দাপট।

খোকন নামে এক সেবা গ্রহীতা বলেন, এর আগেও এই তহশিলদারের বিরুদ্ধে সরকারি গাছ কাটার অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ হয়, পরে তিনি শোকজ হন। এখন আবার একই খেলা শুরু করেছেন।

এসিল্যান্ড অফিসে শুধু তহশিলদার নয়, পিয়নদের দাপটেও টেকা যায় না। টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। বহুবার অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি, উল্টো হুমকি পেয়েছি।

অভিযোগ প্রসঙ্গে তহশিলদার আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি বলেন, ডিসি স্যার গণমাধ্যমে আমাদের কথা বা বক্তব্য দিতে নিষেধ করেছে।

তাই আমি কোন কথা বলতে পারব না। আমার বক্তব্য নিতে হলে আপনাকে আগে ডিসি স্যারের অনুমতি লাগবে। ডিসি স্যারের সাফ কথা মিডিয়ায় কথা বলা যাবে না।

ভুল্লী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরে আলম সিদ্দিকী বলেন, এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি গ্রহণ করা হয়েছে।

অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারের নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আজমির শরিফ মারজী বলেন, তহশিলদারের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ তাদের কাছে এসেছে। অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হবে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশাদুল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, একটি অভিযোগ পেয়েছি। এবিষয়ে তদন্ত চলছে।

তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বুলবুল আহমেদ বলেন, বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। লিখিত অভিযোগ ও জিডির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর