কাশ্মীরে পাকিস্তানি আগ্রাসনের প্রতিকারে গান্ধীর চিন্তাভাবনা

আপডেট: February 5, 2021 |
print news

পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে কাশ্মীর দখল করে নেওয়ার লক্ষ্যে আগ্রাসন চালায়। কাশ্মীরের অধিবাসীর বেশির ভাগই মুসলমান। তারা যদি তাদের আবাসভূমিকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করতে চায় তাহলে দখলের জন্য আগ্রাসন কেন? বিষয়টি মহাত্মা গান্ধীকে বিচলিত করে।

পাকিস্তান যে হঠাৎ কাশ্মীরে আক্রমণ চালিয়ে কিছু জায়গা কব্জা করে নিয়েছে ভারত সেটা সরকারিভাবে জানায় ২৪ অক্টোবর (১৯৪৭) শুক্রবার রাতে। থাইল্যান্ডের সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মানে ভোজসভা চলছিল; সেখানেই প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এ কথা বলেছিলেন।

২৫ অক্টোবর সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল রব লকহার্ট পাকিস্তানি সেনা সদর দফতরের একটি টেলিগ্রাম পড়ছিলেন। তাতে বলা হয়, প্রায় ৫ হাজার উপজাতীয় লোক আক্রমণ চালিয়ে মুজাফফরাবাদ ও ডোমেল দখল করে নিয়েছে। আক্রমণকারী উপজাতীয়দের সঙ্গে আরও উপজাতীয় যুক্ত হতে যাচ্ছে। তারা ইতিমধ্যে শ্রীনগর থেকে ৩০ মাইলের একটু দূরে গিয়ে পৌঁছেছে।

জম্মু ও কাশ্মীরের অস্থির উদ্বিগ্ন মহারাজা হরি সিং মরিয়া হয়ে সশস্ত্র সহায়তা দেওয়ার জন্য দিল্লিকে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু লর্ড মাউন্টব্যাটেন (ভারতের তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল) সশস্ত্র সহায়তা প্রাপ্তির জন্য আবশ্যকীয় শর্ত পালনের ওপর জোর দেন। সেটা হলো, কাশ্মীরের ভারতে যোগদান। মাউন্টব্যাটেন তখন পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজের প্রতিনিধি এবং ভারতীয় বাহিনীর দায়িত্বেও রয়েছেন ব্রিটিশ অফিসাররা। কাগজে কলমে কোনো নির্দেশনা পাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা শ্রীনগরে ভারতীয় সেনা পাঠানোর কাজটি কখনই করবেন না।

মাউন্টব্যাটেনের প্রেস অ্যাটাশে অ্যালান ক্যাম্পবেল-জনসন তাঁর ডায়রিতে লিখেছেন, মহারাজা যোগদান করায় ভারতের নেওয়া পদক্ষেপগুলো পুরোপুরি বৈধতা পেয়ে গেল। সেদিক থেকে ব্রিটেন হলো প্রথম বিদেশি রাষ্ট্র যে কাশ্মীরের ভারতে যোগদান মেনে নিয়েছিল। শ্রীনগরে ভারতীয় সেনা পৌঁছুলে তার জবাবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (পাকিস্তানের গভর্নর) পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অস্থায়ী কমান্ডার-ইন-চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যার ডগলাস গ্রেসিকে যুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সৈন্য পাঠানোর নির্দেশ দেন। জেনারেল গ্রেসি বলেন, সুপ্রিম কমান্ডারের (মাউন্টব্যাটেন) অনুমোদন ব্যতিরেকে সেনা পাঠানোর নির্দেশদানে তিনি প্রস্তুত নন।

২৬ অক্টোবর ছিল পবিত্র ঈদুল আজহা। এদিন তিনি মুসলমানদের উদ্দেশে দেওয়া বাণীতে বলেন, ‘এদিন আমাদের শপথবদ্ধ হতে হবে যে আমরা রক্তের বদলে রক্ত ঝরাব না। সত্যের জন্য, ভালোবাসার জন্য, মমতার জন্য আমরা বরং নিজের রক্তটাই দেব। ঈশ্বর আমাদের সেই শক্তি দিন, এটাই আমার প্রার্থনা।’

কাশ্মীর পরিস্থিতির ওপর গান্ধী প্রথমবারের মন্তব্য করেন ঈদুল আজহার দিনই তাঁর বৈকালিক প্রার্থনা সভায়। তিনি বলেন, ‘খবরের কাগজে যা পড়ছি তার সবই যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে তো সত্যিই খারাপ অবস্থা। এটাই শুধু বলতে পারি যে, এভাবে আমরা আমাদের ধর্মকে রক্ষা করতে পারব না; নিজেদের রক্ষা করতে পারব না। খবর বেরিয়েছে, পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার জন্য কাশ্মীরের ওপর জবরদস্তির চেষ্টা করছে পাকিস্তান। এ রকম করা উচিত নয়। বলপ্রয়োগে কারও কাছ থেকে কিছু কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’

গান্ধী আরও বলেন, ‘মানুষের ওপর হামলা চালিয়ে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তাদের বাধ্য করা যায় না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা সত্তে¡ও কাশ্মীরের জনগণ যদি ভারতে যোগ দিতে চায় কেউই তাদের রুখতে পারবে না। পাকিস্তানের লোকেরা যদি কাশ্মীরের লোকদের ওপর জোর খাটাতে চায় তাহলে পাকিস্তান সরকারেরই উচিত তাদের থামিয়ে দেওয়া। যদি তা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে তাকেই (পাকিস্তানকে) এর পুরো দায় নিতে হবে।’

পরদিন, ২৭ অক্টোবর তিনি বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে এক চিঠিতে বলেন, ‘হিন্দু আর মুসলিম দুই জাতি নয়। মুসলমানরা কখনই হিন্দুর দাস হবে না, হিন্দুরাও হবে না মুসলমানের দাস। তাই, তারা যাতে পরস্পর ভাই-ভাই বাস করতে পারে (তারা তো সত্যিই ভাই-ভাই) সেই চেষ্টা চালাতে গিয়ে আমাকে আর আপনাকে প্রয়োজনে মরতে হবে।’ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটি ভারতে যুক্ত হতে চাইছে, এতে গান্ধী কোনো অসামঞ্জস্যই দেখেননি।

২৯ অক্টোবর ভারতীয় সেনারা শ্রীনগর বিমানবন্দর রক্ষা করল। তবে রাজধানীর ৫ মাইলের মধ্যে তুমুল লড়াই চলতে থাকে। মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে ৯০ মিনিট ধরে আলোচনাকালে সংকট সম্পর্কে অবহিত হলেন গান্ধী। সেদিন বিকালে তাঁর প্রার্থনা সভায় ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিশদ বর্ণনা করেন। বললেন, ‘এটা হতভম্ব হয়ে যাওয়ার মতো একটা কাহিনি।’

গান্ধীর সঙ্গে আলাপকালে মহারাজার ভারতে যোগদানকে ‘স্বাগত’ জানান মাউন্টব্যাটেন। তিনি ১৫০০ ভারতীয় সেনার বিপুলসংখ্যক উপজাতীয় যোদ্ধার সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের প্রশংসা করেন। ‘আফ্রিদি’ উপজাতীয় এই যোদ্ধাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়েছে পাকিস্তানি সেনা অফিসাররা। এ ব্যাপারে খুব একটা রাখঢাকও তারা করেনি। অবস্থাটাকে পাকিস্তান বলেছে, ‘স্বাধীনতার জন্য স্বেচ্ছায় জাগরণ।’

সামরিক প্রত্যুত্তর আর বেসামরিক ত্যাগ স্বীকার দ্বারা আগ্রাসন যে পরাভূত করা দরকার এতে গান্ধী কোনো সন্দেহ পোষণ করেননি। অ্যালান ক্যাম্পবেল-জনসন লিখেছেন, কাশ্মীর বিষয়ে গান্ধীর কথাবার্তা চার্চিলের ধরনেরই অনেকটা। গান্ধী বলেন, ‘মানুষ কেবল আমরণ লড়ে যেতে পারে; ফলাফল ঈশ্বরের হাতে।’ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে: ভারতের ছোট সেনাদল যদি থার্মোপিলাই যুদ্ধে (সংঘটিত হয় খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে পারস্য বাহিনীর বিরুদ্ধে) স্পার্টা রাজ্যের সেনাদের মতো সাহসের সঙ্গে লড়তে লড়তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, তাতে তিনি অশ্রুপাত করবেন না। কাশ্মীরকে রক্ষা করতে গিয়ে শেখ আবদুল্লাহ (কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী) এবং তাঁর হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সাথীরা যদি মারা যেতে থাকেন তাতেও তাঁর দুঃখ নেই। ভারতের অন্যান্য এলাকার জন্য ওটা হবে গৌরবময় উদাহরণ। বীরত্বব্যঞ্জক সেই প্রতিরক্ষার দ্বারা প্রভাবিত হবে সমগ্র উপমহাদেশ। তাতে করে সবাই ভুলে যাবে যে হিন্দু-মুসলিম-শিখরা কখনো একে অন্যের দুশমন ছিল।

(এম জে আকবরের ‘দ্য মহাত্মা অ্যান্ড কাশ্মীর’ শীর্ষক নিবন্ধের উদ্ধৃতাংশ)।

বৈশাখী নিউজজেপা

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর