কপ২৬ : ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতি না রাখলে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলা দুরূহ

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও এর বিরূপ প্রভাব একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট মারাত্মক ঝুঁকির মুখে রয়েছে। একদিকে ক্রমাগত উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে হিমালয় কিংবা মেরু অঞ্চলে সঞ্চিত বরফগলা পানি বৃদ্ধি জলবায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, বাড়ছে প্রাণহানির আশঙ্কা। ভূমিকম্প, সুনামি, উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় এবং বন্যাসৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ বার্ষিক গড়পড়তা শত শত বিলিয়ন ডলার।

বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা সত্ত্বেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সংঘটিত মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। আন্তর্জাতিকভাবে দেখানো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ১৯৯০ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে।

আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে হলে চুপ করে বসে থাকার সুযোগ নেই। পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে।

যেভাবে এর উষ্ণতা বাড়ছে, তা চলতে থাকলে শুধু বাংলাদেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বিশ্বের বহু দেশ এবং যত নামকরা প্রতিষ্ঠান—হার্ভার্ড, এমআইটি সব পানির নিচে চলে যাবে। পৃথিবীর ভূখণ্ডের বহু জায়গা পানির নিচে চলে যাবে। পৃথিবীকে অবশ্যই বাঁচাতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।

আমরা বিশ্বের সপ্তম ঝুঁকিগ্রস্ত দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নানামুখী ঝুঁকি নিয়ে আমাদের বসবাস।

আমাদের দেশের উন্নয়নের সঙ্গে এ এ বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ঝুঁকি দ্রুতই হ্রাস করা না গেলে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে তেমন সুফল বয়ে আনতে পারবে না। এ বিষয় আমাদের বুঝতে হবে।

যেসব দেশ এখনো ঝুঁকিগ্রস্ত নয়; দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রক্রিয়া যেভাবে বেড়ে চলছে, এভাবে চলতে থাকলে সবাই ঝুঁকিগ্রস্ত হয়ে যাবে। তখন সব দেশের জন্য এটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে, যা পয়সা খরচ করেও পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম উন্নয়নশীল দেশ। বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ হয়েও অন্যান্য দেশ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রোগ্রাম হাতে নেয়নি, তখন শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে কম্প্রিহেনসিভ ক্লাইমেট প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলেন।

নিজের তহবিল থেকে টাকা খরচ করে একটা দারুণ উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করেছেন জাতির জনকের কন্যা। অন্য কোনো দেশ যে বিষয় করার সাহস এবং বুদ্ধি কোনোটিই পায়নি।

এতে কতটুকু কাজ হয়েছে, সেটা বিবেচানাধীন বিষয়, তবে এ কাজের প্রচেষ্টা, যে উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন, তা ছিল এক কথায় অসাধারণ। অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও সময়োপযোগী ছিল তার পদক্ষেপ।

প্রতি বছর জলবায়ু পরবির্তনের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশে ২ শতাংশ জিডিপি নষ্ট হচ্ছে। আগামীতে ২০৫০ সালের দিকে আমাদের প্রায় ৯ শতাংশ জিডিপি ধ্বংস হবে, যা বিরাট উদ্বেগের বিষয়।

ভবিষ্যৎ বিবেচনায় আমাদের অবস্থা খুবই সংকটাকীর্ণ। সুতরাং এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য দ্রুত আমাদের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ খাতে ব্যয়ের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের বন্দোবস্ত করতে হবে। বাংলাদেশের একার পক্ষে এ কঠিন পরিস্থিতি বদলে দেয়া সম্ভব নয়।

অর্থনৈতিকভাবে উন্নত বিশ্বের মতো এত সক্ষমতাও আমাদের নেই। আমরা এতদিন ধরে জলবায়ু পরির্বতন ও এর ঝুঁকি মোকাবেলায় যেসব উদ্যোগ নিয়েছি, তা কেবল আগ্রহ ও সচেতনতা থেকে করেছি। সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও বাংলাদেশ চেষ্টা করছে।

এখন অন্যদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সেজন্য আমরা চারটি দাবি তুলেছি। একটি দাবি হচ্ছে যে পৃথিবীর যেসব দেশ বেশি কার্বন নিঃসরণ করে, যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত তাদের এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।

এই উন্নত দেশগুলো পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ নিঃসরণ করে; আমরা শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ করি। এ নিঃসরণগুলো আগ্রাসীভাবে থামাতে হবে, যাতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিঃসরণ ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নেমে আসে। তা না হলে পৃথিবী টিকে থাকবে না।

আমাদের দ্বিতীয় দাবি হচ্ছে, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির সময় ধনিক দেশগুলো বলেছিল যে, উন্নত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রতি বছর ১০০ বিলিয়ন ডলার দেবে। কিন্তু এখনো এক পয়সার চেহারাও আমরা দেখিনি। এটা অবশ্যই তাদের দিতে হবে। এটা খুব কঠিন না।

প্রতি বছরে প্রায় ২ হাজার ৩০০ বিলিয়ন ডলার শুধু মারণাস্ত্র ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে খরচ হয়। প্ল্যানেটারি ডিফেন্সের জন্য এ টাকার থেকে যদি ৫ শতাংশ জলবায়ূ তহবিলে প্রবাহিত করে তাহলে ১১৫ বিলিয়ন আপনাআপনিই পূরণ হয়ে যায়।

সুতরাং এটা কোনো বড় ব্যাপার না। এটা তাদের দিতে হবে। এর পরে আমরা এ টাকার ৫০ শতাংশ অভিযোজনের জন্য এবং ৫০ শতাংশ প্রশমনের জন্য ব্যয় করব। কারণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু অভিযোজন পর্যাপ্ত নয়।

অভিযোজন জরুরি কিন্তু অভিযোজন করে সব অভিঘাত মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। অভিযোজনের পাশাপাশি জরুরি পর্যায়ে প্রশমন করতে হবে; পৃথিবীর উষ্ণতা কমাতে হবে।

তৃতীয় দাবি হচ্ছে, প্রতি বছর আমাদের দেশে হাজার হাজার লোক নদীভাঙন, সমুদ্রের উষ্ণতা, লবণাক্ততা এবং সামুদ্রিক ঝড়ের ফলে গৃহহারা হচ্ছে, বাস্তুহারা হচ্ছে; তাদের চিরাচরিত কাজ থেকে তারা বিতাড়িত হচ্ছে।

এরা শহরগুলোয় এসে পড়ছে এবং শহরে এসে বস্তি তৈরি করছে। সরকার বাধ্য হয়ে এদের পুনর্বাসন করছে। এই যে ‘ক্লাইমেট মাইগ্রেটেড’ মানুষ, তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব সব দেশের হওয়া উচিত। এটা শুধু বাংলাদেশের হওয়া উচিত নয়।

এ পুনর্বাসনের এ বোঝা ভাগাভাগি করা উচিত; অন্য দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিত। এটা আমাদের দাবি।

বস্তুত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, সেটার জন্য উন্নত দেশগুলোর সাহায্য করা উচিত। ক্ষতির কারণ যেহেতু উন্নত দেশগুলোর যারা কার্বন নির্গমন করছে, সুতরাং ক্ষতি পুষিয়ে নিতেও তাদের সাহায্য করা উচিত। এটা কখনো কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। এসব দাবি আমরা তুলে যাচ্ছি।

চতুর্থ দাবি হচ্ছে, আমরা আমাদের দেশে গ্রিন এনার্জি বা রিনিউয়েবল এনার্জি অধিক ব্যবহার করতে চাই এবং কয়লাভিত্তিক ক্ষতিকর এনার্জি বাদ দিতে চাই।

তার জন্য আমাদের নতুন নতুন প্রযুক্তি দরকার। দরকার স্বল্প সুদে ঋণ, যাতে আমরা ক্ষতিকর এনার্জির স্থলে রিনিউয়েবল এনার্জি উৎপাদন করতে পারি। তবে এ বছরটা খুবই খুুুশির। ইংল্যান্ড ও ইউরোপ তারা সবসময়ই জলবায়ুর বিষয়ে স্পর্শকাতর।

এ ব্যাপারে তারা ভালো কাজ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আর দ্বিতীয়ত, আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকার প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। এখন বাইডেন প্রশাসন আবার যোগদান করেছে।

এটা একটা খুশির সংবাদ; বিশেষ করে সিনেটর কেরি, যিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে যোগদান করেছেন। তিনি প্যারিস চুক্তি সহজ করেছিলেন। এজন্য আমরা আশাবাদী।

বাংলাদেশ জলবায়ু উদ্যোগ নিয়ে একটা উদাহরণ দেখিয়েছে এবং সেরূপ উদাহরণ অন্য দেশগুলোরও দেখানো উচিত।

আমরা আগামীতে নবায়নযোগ্য এনার্জি অধিকতর ব্যবহার করতে চাই। সেটা ২০৩০-এর মধ্যে ৪০ শতাংশ করতে চাই। জ্বালানিজনিত দূষণ কমানোর জন্য বাংলাদেশ নন-রিনিউয়েবল এনার্জির ব্যবহার শূন্য মাত্রায় নামিয়ে আনতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে, যেটা পৃথিবীর সবার জন্য একটা মডেল হিসেবে অনুসরিত হওয়া উচিত।

আমাদের এখানে ১০টি কয়লাভিত্তিক পাওয়ার প্লান্ট হওয়ার কথা ছিল, ফলে আমাদের এখানে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশী বিনিয়োগ হতো এবং সেটা মোটামুটি চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল।

কিন্তু ফাইনাল পর্যায়ে আসার পরেও এবং আমাদের এনার্জির প্রয়োজন অধিকতর থাকার পরেও আমরা জলবায়ুর দিকে তাকিয়ে, ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এ ধরনের ১০টি পাওয়ার প্লান্ট প্রকল্প বাদ দিয়েছি। এতে আমাদের ক্ষতি হয়েছে কিন্তু আমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য এ পদক্ষেপ নিয়েছি।

বাংলাদেশের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ অন্যান্য দেশের অনুসরণ করা উচিত। বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোর এগিয়ে আসা উচিত এবং বাংলাদেশের উদাহরণ অনুসরণ করা উচিত।

এ রকম বড় একটা সিদ্ধান্ত আমাদের মতো দেশ নিতে পেরেছে, তাদেরও নেয়া উচিত। শুধু আশ্বাস আর উপদেশ দিয়ে কাজ হয় না। এটা একটা বড় বার্তা হবে যে বাংলাদেশ যা করছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে, বাকিদেরও এটা করা উচিত।

যাতে সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমাদের পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারি। শুধু মুখে কথা না বলে, কাজের মাধ্যমে তাদের এগোতে হবে। এবারের ক্লাইমেট ফোরামের প্রতিপাদ্য বিষয় হবে, ‘অ্যাকশন নাও, নট টুমোরো’। এটা বাণী হওয়া উচিত পৃথিবীর সব দেশের। আমরা এ বিষয়ে আশাবাদী।

বাংলাদেশের দেখাদেখি অন্যান্য দেশও যার যার দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে এগিয়ে আসবে। বস্তুত. সবার সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের এ মারাত্মক হুমকি কোনো দেশের একার পক্ষে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

এবারের জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ, ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’টি সবার কাছে তুলে ধরছে এবং প্রত্যাশা করবে অন্যান্য দেশও বাংলাদেশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে অনুরূপ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

লেখক: ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন,পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার