প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে বোনের গায়ে আগুন

নরসিংদীতে জমি সংক্রন্ত বিষয়ের জের ধরে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতেই বোনের গায়ে আগুন দেন আপন ফুফাত ভাই। আগুন দেয়ার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করেছেন নরসিংদীর বীরপুরে দগ্ধ ফুলন বর্মনের সেই ভাই ভবতোষ বর্মন ও তার বন্ধ রাজু সুত্রধর। শনিবার বিকেলে নরসিংদী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনা আক্তার এর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবান্দি দেন ভবতোষ। এর আগে, শুক্রবার বিকালে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আক্তার পিংকীর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রাজু।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে নরসিংদীর বীরপুরে কলেজছাত্রী ফুলন বর্মন কেক নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। বাড়ির আঙ্গিনায় পৌঁছলে পূর্ব থেকে ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা দুইজন দুর্বৃত্ত তার হাত মুখ চেপে ধরে। পরে টেনে হিঁচড়ে পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই সময় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা যোগেন্দ্র বর্মন বাদী হয়ে আজ্ঞাত নামা দুইজনকে আসামী করে সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার তদন্ত ভার পড়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। এরই প্রেক্ষিতে ডিবি উপ-পরিদর্শক আব্দুল গাফফারের নেতৃত্বে অভিযানে নামে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের ৪ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে রাজু সুত্রধর নামে আরও একজনকে শহরের শিক্ষা চত্বর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজুর দেয়া তথ্য মতে, ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ ও আনন্দ নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় পুলিশের কাছে আগুন দেয়ার কথা স্বীকার করেন রাজু। পরে গ্রেপ্তারকৃত রাজু শুক্রবার বিকেলে নরসিংদীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আক্তার পিংকীর আদালতে নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। এরপর আজ শনিবার বিকেলে কলেজ ছাত্রী ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ বর্মণ নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে বিচারকের সামনে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন।

জবাবন্দিতে রাজু ও ভবতোষ উল্লেখ করেন, ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজু সূত্রধর ও আনন্দ বর্মন। ফুলনের পিতা যোগেন্দ্র এর সাথে প্রতিবেশী সুখ লাল ও হিরা লালের সাথে বাড়ির জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে এলাকায় সালিশ বৈঠক হয়েছে। ঘটনার দুইদিন আগে ১১ জুন ভবতোষ ও তার মামি (ফুলনের মা) এর সাথে ঝগড়া হয় প্রতিবেশী সুখ লালের। এ ঝগড়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ফুলনের মা বলেন, এখানে থাকবো না। দরকার হয় জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাব। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ফুলনের শরীরে আগুন দিয়ে প্রতিবেশীকে মামলায় ফাঁসানোর  পরিকল্পনা করে কলেজছাত্রী ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ। ঘটনার দিন ভবতোষ ও তার বন্ধু রাজু সূত্রধর ও আনন্দ বর্মনকে নিয়ে বীরপুর রেল লাইনে বসে কীভাবে কাজ সম্পন্ন করা হবে সে পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী মামাতো বোন ফুলন কেক নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ফুলনের মাথায় ও শরীরে কেরোসিন ঢেলে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেন ভবতোষ ও তার বন্ধুরা। আগুন দেয়ার পর ভবতোষ, আনন্দ একদিক দিয়ে ও রাজু অন্য দিক দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক আব্দুল গাফফার বলেন, বর্তমানে অগ্নিদগ্ধের বিষয়টি খুবই আলোচিত ও সংবেদনশীল। তাই অপরাধীরা প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে এই পথ বেছে নেয়। এতে করে প্রতিবেশীও দমন হবে। আবার সম্পত্তির ওয়ারিশ পাবে ভবতোষ। সেই লোভ থেকেই তারা এই কাজ করেছে বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।

তিনি আরও বলেন, দগ্ধের ঘটনাটিকে ফাস্টট্রেক হিসেবে গুরুত্ব দেয় জেলা পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন (বিপিএস) স্যার। ওনার নির্দেশনা নিয়েই তদন্তে নামি। এবং ঘটনার ৯ দিনের মধ্য এর নেপথ্যের রহস্য উদঘাটন করা হয়েছে।