মরিয়ামের বাবাকে কোটিপতি বানানো স্বপ্ন দেখান গাজী নজরুল

আপডেট: July 25, 2026 |
212 Recovered Recovered Recovered Recovered Recovered Recovered Recovered Recovered copy 13
print news

মরিয়াম বেগমের সঙ্গে ‘অবৈধ’ সম্পর্ক রাখতে এবং বিষয়টি গোপন রাখার জন্য তাঁর বাবা মাসুম বিল্লাহকে ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দিয়ে সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম। আশ্বাস দিয়েছিলেন কোটিপতি বানিয়ে দেওয়ার।

এই দাবি করেছেন গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, টাকার লোভে মরিয়ামের মা–বাবা সংসদ সদস্যের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি করেননি।

সম্পর্কে মরিয়ামের মামা হন ওবায়দুর। গাজী নজরুলের গাড়ি চালানোর পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে ওবায়দুরের আত্মীয়তা রয়েছে মরিয়ামের বাবার সূত্রে। ওবায়দুর জানান, গাজী নজরুল সম্পর্কে মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহর খালু।

সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের (৭৫) ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তে’র একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। ভিডিওতে তাঁর সঙ্গে এক তরুণীকে দেখা যায়। আলোচনায় ওঠার পর গাজী নজরুল জানান, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়াম।

গাজী নজরুল তখন অভিযোগ করেছিলেন, ১৩ জুলাই মরিয়ামের বাবার অফিসে তাঁকে জিম্মি করে ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন ওবায়দুর রহমান। ভিডিও ফাঁসও তিনিই করেছেন।

অন্যদিকে ২১ জুলাই রাজধানীর পল্লবী থানায় গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন ওবায়দুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, নজরুল ইসলামের সঙ্গে ভাগনির ‘অনৈতিক সম্পর্কের’ প্রতিবাদ করা এবং ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় সন্দেহের জেরে ১৪ জুলাই তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়।

‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে, বলেছিলেন মাসুম’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই মরিয়ামদের পল্লবীর ভাড়া বাড়িতে গাজী নজরুলের যাতায়াত ছিল বলে জানান ওবায়দুর। তাঁর ভাষায়, ‘এমপি হোস্টেলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পরও গাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় আসলে মরিয়ামদের বাড়িতেই থাকতেন।’

ওবায়দুর দাবি করেন, ভাগনির সঙ্গে গাজী নজরুলের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে সেটি পরিবারের সামনে তুলে ধরেন তিনি। তখন মরিয়মের মা–বাবা তা গোপন রাখতে চান।

ওবায়দুরের ভাষায়, তাঁর বোনের স্বামী মাসুম বিল্লাহ বলেছিলেন, ‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে। পাঁচ বছরে আমাদের অনেক কিছু করে নিতে হবে।’

এই ‘কিছু করে নেওয়া’র তথ্যও দেন ওবায়দুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরেই মাসুম বিল্লাহর নামে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দেন গাজী নজরুল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম ‘মাসুম এন্টারপ্রাইজ’। মাসুমের কাজ ছিল শুধু দরপত্র জমা দেওয়া। কাজ পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেন গাজী নজরুল নিজেই।

ওবায়দুর বলেন, ‘মাসুম কন্ট্রাক্টরির কিছুই বুঝত না। দায়িত্ব দেয় আমাকে। আমিও এসবের কিছু বুঝি না। তারপরও খেজুরের ব্যবসা বন্ধ করে টেন্ডারের বিষয়টি দেখাশোনা করছিলাম।’ তাঁর দাবি, তাঁদের প্রতিষ্ঠান থেকে সাতক্ষীরার দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে মোট পাঁচটি কাজের দরপ্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি ছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এবং বাকিগুলো শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের।

ওবায়দুর দাবি করেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি পদে তাঁদের অনুকূল একজন প্রকৌশলীকে বদলি করে আনার জন্য এমপি নিজেই তদবির করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ দেওয়ার জন্য ওই প্রকৌশলীকে সেখানে বসানো হয়েছিল।’

মরিয়ামকে সংসদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি ওবায়দুরের। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে বলা হতো সংসদে চাকরি দেওয়া হবে। আর বাবাকে বলা হতো, বড় বড় কাজ দেওয়া হবে। এই লোভ দেখিয়েই পুরো বিষয়টি চলছিল।’

মুখ বন্ধ রাখতে ‘প্রলোভন দেখানো হয়’

ওবায়দুর রহমানের দাবি, গত ২০ জুন এমপি হোস্টেলে গিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের কাছে ভাগনির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তখন গাজী নজরুল ‘মুতআ বিয়ে’র (অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়ে) ফতোয়া দিয়ে সম্পর্কটি বৈধ বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

এরপর মুখ বন্ধ রাখতে গাজী নজরুলের পক্ষ থেকে একটি গাড়ি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন ওবায়দুর। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে বলা হয়েছিল এমপি ঢাকায় থাকলে তিনি ওই গাড়ি চড়বেন। আর বাকি সময় গাড়িটি নিজের মতো ব্যবহার করে আয় করতে পারবেন ওবায়দুর। পাশাপাশি তাঁকে এমপির এপিএস-২ (সহকারী একান্ত সচিব) হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

ওবায়দুর বলেন, ‘আমি যখন সবকিছু জেনে যাই, তখনই আমাকে এসব প্রলোভন দেখানো হয়।’

ওবায়দুরের এসব বক্তব্যের বিষয়ে জানতে আজ গাজী নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকভাবে যোগাযোগ করে প্রথম আলো। তবে তাঁর ব্যক্তিগত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

নৈতিক স্খলনের কারণে জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। এর পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না।

মরিয়ামের বাবা মাসুম বিল্লাহর ফোনে আজ কল করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

এদিকে ভিডিও প্রকাশের পর গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রীর পাশাপাশি মরিয়ামও একটি ভিডিও বক্তব্য দেন, সেখানে তিনি গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগ করেন।

মরিয়াম বলেন, ২০২৬ সালের ১৭ জুন উভয় পরিবারের সম্মতিতে সাতক্ষীরা শ্যামনগর তাঁর বাবার বাড়িতে তাঁর ও গাজী নজরুলের বিয়ে হয়। বিয়েতে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন।

মরিয়াম আরও বলেন, ১৩ জুলাই ঢাকায় মগবাজার তাঁর বাবার অফিসে গেলে পরিকল্পিতভাবে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ তৈরি করা হয় এবং পরে তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

সূএ : প্রথম আলো

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর