ক্ষমতায় থাকতেও আ.লীগের কারো কাছ থেকে ভিক্ষা নিতেন না মকবুল প্রামানিক

আপডেট: October 20, 2026 |
ishrak
print news

য়স ৭৫ বছর। পরিচিতি মকবুল ফকির নামে। পেশায় ভিক্ষুক হলেও রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি বিএনপির একনিষ্ঠ সমর্থক। জীবনের দীর্ঘ সময় নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল থাকা এই বৃদ্ধ এখন চরম অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অসুস্থ স্ত্রী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসারে নিত্যদিনের সঙ্গী অভাব-অনটন।

পাবনার চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল ইউনিয়নের নবীন পশ্চিমপাড়া গ্রামে একটি জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় শুয়ে দিন কাটছে মকবুল হোসেন প্রামানিকের। বয়সের ভার ও নানা অসুস্থতায় এখন আর চলাফেরা করতে পারেন না তিনি। অর্থের অভাবে মিলছে না প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ভিক্ষা করতে গিয়েও নিজের রাজনৈতিক আদর্শের বিষয়ে আপসহীন ছিলেন মকবুল। কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থক পরিচয় দিলে তাঁর কাছ থেকে ভিক্ষা নিতেন না বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

মকবুলের পরিবারের অভিযোগ, বিএনপির রাজনীতির প্রতি সমর্থনের কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। স্ত্রী ও দুই শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করেছেন এই বৃদ্ধ।

বর্তমানে পরিবারের একমাত্র ভরসা বড় মেয়ে মর্জিনা খাতুন। শারীরিক প্রতিবন্ধী মর্জিনার বিয়ে হয়েছিল। পরে দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ ঘটলে তিনি মা-বাবার কাছে ফিরে আসেন। এখন ভিক্ষা করে যা উপার্জন করেন, তা দিয়েই কোনো রকমে চলে পরিবারের খরচ।

সরেজমিনে দেখা যায়, মকবুলের বসতঘরটি ভাঙাচোরা টিন দিয়ে তৈরি। পাটকাঠি ও পলিথিনে ঘেরা বারান্দার ছাউনির নিচে ছোট একটি চৌকিতে শুয়ে আছেন তিনি। বিছানায় নেই তোশক কিংবা বালিশ। বাড়িতে নেই কোনো শৌচাগারের ব্যবস্থাও।

বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে কয়েক বছর ধরে ঘর থেকে বের হতে পারেন না মকবুল। দীর্ঘদিন একই অবস্থায় শুয়ে থাকায় তাঁর পিঠ ও পায়ে ঘা দেখা দিয়েছে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না।

কষ্টে কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মকবুল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “শহীদ জিয়া অমর হোক। খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ। আমি বিএনপি করি। বিএনপি ছাড়া কখনো কাউকে ভোট দিইনি। আমি বিএনপি করেই মরতে চাই।”

মকবুলের স্ত্রী মালেকা খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী বিএনপির প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিলেন। অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নামও তিনি সহ্য করতে পারতেন না। মালেকার অভিযোগ, রাজনৈতিক সমর্থনের কারণে তাঁদের পরিবার সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। দুই মেয়েই শারীরিক প্রতিবন্ধী। বড় মেয়ের সংসার ভেঙে যাওয়ার পর তিনি ফিরে আসেন মা-বাবার কাছে। বর্তমানে তাঁর ভিক্ষার আয়েই পরিবারের সদস্যদের বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

হান্ডিয়াল ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, মকবুল বিএনপির একজন নিবেদিত সমর্থক। তাঁর দাবি, একবার স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা মকবুলকে এক মণ চাল দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার শর্ত থাকায় সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন মকবুল।

হাবিবুর রহমান আরও বলেন, মকবুল ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদের দুর্দশা লাঘবে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

রাজনৈতিক বিশ্বাসে অটল মকবুল ফকিরের জীবনের শেষ সময় কাটছে চরম অভাব আর অসুস্থতার মধ্যে। জরাজীর্ণ ঘরে শুয়ে থাকা এই বৃদ্ধের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন চিকিৎসা, নিরাপদে বেঁচে থাকার পরিবেশ এবং অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর মতো মানুষের সহযোগিতা।

Share Now