ইবিতে বিদেশি শিক্ষার্থী কমছে, নেপথ্যে যেসব কারণ

ইবি প্রতিনিধি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক কম খরচে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও দিন দিন কমছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা।
পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণার অভাব, বৃত্তি ও টিউশন ফি মওকুফের সুযোগ না থাকা, ভাষাগত জটিলতা, প্রত্যাশিত একাডেমিক পরিবেশ না পাওয়া এবং সামাজিকভাবে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীরা। তবে আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে অনেকেই তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী বলে মনে করেন।
জানা যায়, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এ পর্যন্ত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নেপাল, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, গাম্বিয়া ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের মোট ৭২ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
তাঁদের মধ্যে ৩৬ জন কোর্স সম্পন্ন করেছেন, ২৩ জন ঝরে পড়েছেন এবং ১৩ জনের পড়াশোনা চলমান রয়েছে। তন্মধ্যে, ১০ জন পিএইচডি ও এমফিল করছেন এবং বর্তমানে অনার্সে অধ্যয়নরত আছেন মাত্র তিনজন, গাম্বিয়ার একজন ছাত্রী ও নেপালের দুজন ছাত্র।
নেপাল হতে আগত ফার্মেসি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী প্রবেশ কুমার মাহাতো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমাদের বড় কোনো অভিযোগ নেই।
তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নেপালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত প্রচার-প্রচারণা নেই। মানুষের কাছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য ও সুযোগ-সুবিধা যথেষ্টভাবে পৌঁছাচ্ছে না।’
ইবিতে পড়াশোনার ব্যয়কে সাশ্রয়ী উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। তবে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে খরচ করছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। খাবারের জন্য মাসে গড়ে তিন হাজার টাকাতেই স্বাস্থ্যকর খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব।’
বৃত্তি ও অন্যান্য সুবিধার বিষয়ে প্রবেশ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বৃত্তি, টিউশন ফি মওকুফ বা স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা নেই। এসব বিষয়ে আমরা অভিযোগ জানিয়েছি, কিন্তু সেগুলোর কোনো সাড়া পাইনি।’
শিক্ষার ভাষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকেরা বাংলা ও ইংরেজি, দুই ভাষা ব্যবহার করেন। তবে লেকচার ইংরেজিতে দেওয়া হয়। এশিয়ার দেশ থেকে আসায় ভাষাটি শেখা আমার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়েছে। তবে অন্য দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।’
পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বিষয়ে প্রবেশ বলেন, ‘আমি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ইংরেজিতে পেয়েছি। তবে এটি অনেকটা নির্ভর করে আপনি শ্রেণি প্রতিনিধির সঙ্গে কতটা যোগাযোগ রাখছেন তার ওপর।’ তার মতে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মেন্টর বা টিউটরের ব্যবস্থাও নেই।
নেপাল হতে আগত ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আশীর্বাদ যাদব বলেন, ‘আমাদের একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, সেগুলোই দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো অভিযোগ জানালে তা সমাধান হতে কখনো কখনো সময় লাগে।’
তিনি আরও বলেন, ইবিতে পড়াশোনার ব্যয় ‘বাজেট-ফ্রেন্ডলি’। তার মতে, খাবারের জন্য মাসে গড়ে তিন হাজার টাকা খরচ করলেই ভালোভাবে চলা সম্ভব। তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বা অন্য কোনো আর্থিক সহায়তার সুযোগ না থাকাকে সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখেন তিনি।
আবাসন ও জীবনযাত্রার বিষয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীরা জানান, হলের পরিবেশ, টয়লেটের পরিচ্ছন্নতা, ওয়াই-ফাই ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোটামুটি ভালো।
তবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা পানি পরিশোধন ব্যবস্থা থাকলে আরও সুবিধা হতো। অনেক শিক্ষার্থী হলের ডাইনিংয়ের পরিবর্তে নিজেরাই রান্না করে খাবার খান।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন গাম্বিয়া হতে আগত অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সালিমা জালো।
তিনি মনে করেন, বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো আর্থিক ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ।
সালিমা জালো বলেন, ‘অন্যান্য কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হলে নিয়মিত খাবার, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও মাসিক স্টাইপেন্ডের মতো সুবিধা থাকে। কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের খাবার, দৈনন্দিন জীবনযাপন ও চিকিৎসার ব্যয় নিজেদের বহন করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ ও সামাজিকভাবে একীভূত হওয়ার পর্যাপ্ত সহায়তা নেই।
আমরা ভেবেছিলাম শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি আন্তরিক ও যোগাযোগে আগ্রহী হবে। ভেবেছিলাম তারা সামাজিক ও আলোচনাপ্রবণ হবে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় তেমন নয়।’
একাডেমিক পরিবেশের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ফারাক তুলে ধরে সালিমা বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম লেকচার ইংরেজিতে হবে, কিন্তু বাস্তবে তা সবসময় হয় না। আমরা ভেবেছিলাম বিভাগের একাডেমিক বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা হবে, সেটিও প্রত্যাশা অনুযায়ী পাইনি।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি নেওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা উচিত। যদি সেই সহায়তা দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি না করাই ভালো।’
বিদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর শুরুতে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয় অনেককে।
কেউ কেউ পরবর্তীতে বাংলা ভাষা শিখে বিষয়টি সামলে নিলেও নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজিতে দেওয়া হলেও পরীক্ষার ফরম ও কিছু প্রশাসনিক নোটিশ বাংলায় হওয়ায় সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানান তারা।
এ ছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা একাডেমিক মেন্টর বা টিউটরের ব্যবস্থা না থাকায় পড়াশোনা ও প্রশাসনিক কাজে অনেক সময় সহপাঠী বা শ্রেণি প্রতিনিধির ওপর নির্ভর করতে হয়।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের কয়েকজন জানান, তাদের পরিচিত দুই শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে নিজ দেশে ফ
