আত্নারও স্বাধীনতা ঘোষণা

দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে মানবসত্তা। মানুষের উন্নতির জন্য দৈহিক সত্তার যেমন স্বাধীনতা প্রয়োজন, তেমনি আত্মারও স্বাধীনতা প্রয়োজন। দেহের উন্নতি ও সুস্থতার জন্য যেমন প্রয়োজন নির্মল পরিবেশ ও সুষম খাদ্য, তেমনি আত্মার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নির্মোহ অবস্থা ও ইবাদত। ইসলামের প্রথম বাক্য হলো কালেমা তাইয়েবা। কালেমা অর্থ শব্দ, বাণী বা বাক্য; তাইয়েবা অর্থ পাক-পবিত্র। কালেমা তাইয়েবা অর্থ পবিত্র বাণী, পাক কালাম বা পরিশুদ্ধ ঘোষণা। ইসলামের মূল বাণী পবিত্র কালেমায় এ ঘোষণাই দেওয়া হয়েছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, অর্থাৎ ‘এক আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো প্রভু নাই, হজরত মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল’। এ ঘোষণার পর মানুষ সকল প্রকার প্রভুর গোলামি থেকে মুক্ত হয়ে যায় এবং আদর্শ হিসেবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে গ্রহণ করে। এই কালেমা দ্বারা মানুষ আত্মিক শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত স্বাধীনতা লাভ করে।

আত্মার স্বাধীনতা মানুষকে জাতিভেদ ও বর্ণভেদ থেকে মুক্ত করে। ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবাইকে এক কাতারে শামিল করে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) দাসকে সন্তান বানিয়েছেন, ক্রীতদাসকে ভাইয়ের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছেন, গোলামকে সেনা অধিনায়ক বানিয়েছেন।

মনোজাগতিক স্বাধীনতার জন্যই আরব-অনারব, ধনী-দরিদ্র সবাই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে। সারা পৃথিবীতে ইসলামের স্বাধীনতার বাণী বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে। ষড়্রিপু তথা কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য-এই ছয় শত্রুর আনুগত্য থেকে নিজেকে মুক্ত করাই প্রকৃত স্বাধীনতা। কোনো মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত তার শত্রুর আনুগত্য করতে বাধ্য হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। শয়তান হলো মানবের প্রধান শত্রু।

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআন কারিমে বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে দাখিল হও; আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা ২ বাকারা, আয়াত: ২০৮)। ‘তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না, নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা ৬ আনআম, আয়াত: ১৪২) ‘শয়তান তাদের দুজনকে (আদম ও হাওয়াকে) প্ররোচিত করল; অতঃপর যখন তারা দুজনে ওই বৃক্ষের স্বাদ নিল, তখন তাদের বসন আবরণ খুলে গেল, তারা উভয়ে বাগিচার পাতা দিয়ে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করল। তাদের রব তাদের ডেকে বললেন, আমি কি তোমাদের এই বৃক্ষ বিষয়ে নিষেধ করিনি? আমি কি তোমাদের বলিনি? নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? (সুরা ৭ আরাফ, আয়াত: ২২)। ‘হে আদম সন্তান! আমি কি তোমাদের অঙ্গীকার নিইনি যে তোমরা শয়তানের ইবাদত-আনুগত্য করবে না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? আর শুধু আমারই আনুগত্য ও ইবাদত করো, এটাই সঠিক পথ। সে (ইতিপূর্বে) তোমাদের অনেক দলকে বিপথগামী করেছে, তোমরা কি বুঝবে না?’ (সুরা ৩৬ ইয়াসিন, আয়াত: ৬০-৬২)।

ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায় বোঝার জন্য আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন। তাই আল্লাহ এই জগতে মানুষকে কোনো কাজে বাধ্য করেন না। এমনকি ধর্মকর্ম বিষয়েও জোর করা হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ইসলামে জবরদস্তি নাই, সত্যাসত্য সুস্পষ্ট পার্থক্য হয়ে গেছে। যারা অশুভ অসুরশক্তিকে অস্বীকার করে মহান আল্লাহর প্রতি ইমান আনল; তারা মজবুত হাতল দৃঢ়ভাবে ধারণ করল, যা কখনো ভাঙার নয়; আল্লাহ সর্বশ্রোতা মহাজ্ঞানী।’ (সুরা ২ বাকারা, আয়াত: ২৫৬)।

একজন প্রকৃত স্বাধীন মানুষ নিজের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি অন্যের অধিকার রক্ষায়ও নিবেদিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি কি তাকে তার জন্য দুটি চক্ষু সৃষ্টি করিনি? আর জিহ্বা ও ওষ্ঠ অধরদ্বয়? সে তো বন্ধুর গিরিপথে প্রবেশ করেনি! তুমি কি জানো, বন্ধুর গিরিপথ কী? এ হচ্ছে দাসমুক্তি অথবা দুর্ভিক্ষের দিনে আহার্য দান; এতিম আত্মীয়কে অথবা নিঃস্বকে। অতঃপর সে বিশ্বাসী মোমিনদের অন্তর্ভুক্ত হয়, যারা পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের ও দয়াদাক্ষিণ্যের। এরাই সৌভাগ্যশালী। আর যারা আমার নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করেছে, তারাই হতভাগ্য। তারা পরিবেষ্টিত হবে অবরুদ্ধ অগ্নি দিয়ে।’ (সুরা ৯০ বালাদ, আয়াত: ৮-২০)।

অপরিশুদ্ধ আত্মা মানুষকে বিপথগামী করে। আত্মার স্বাধীনতা উন্নত মূল্যবোধ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়। মোহমুক্ত মানুষই সুন্দর মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়। পবিত্র কোরআনের বর্ণনায়, ‘তাকে পরীক্ষা করার জন্য আমি তাকে করেছি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন। আমি তাকে পথনির্দেশ দিয়েছি, হয়তো সে কৃতজ্ঞ হবে, নয়তো সে অকৃতজ্ঞ হবে।’ (সুরা ৭৬ দাহার, আয়াত: ২-৩)।

মুহাম্মদ রেজাউল হক টিটু

সাংবাদিক কলামিস্ট লেখক ও গীতিকার ।