“বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকদের পড়ানোর পদ্ধতি সেকেলে”

মোহাম্মদ রেজাউল করিম, স্টাফ রিপোর্টারঃ টেসল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা মো. ইয়াসির সম্প্রতি তাঁর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেছেন যে,বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকদের পড়ানোর পদ্ধতি সেকেলে।
সেখানে তিনি বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পাঠদানের পদ্ধতি সম্পর্কে একটি বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন সেগুলো হুবহ তুলে ধরা হলো;
কে বলেছে যে অনার্স-মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে ১ম, ২য়, ৩য় হলেই তিনি ভালো পড়াতে জানেন? খুব ভালো নেক্সট জেনারেশন-লিডার তৈরি করতে পারবেন?
আমার দেখা মতে বাংলাদেশের ৯৫% বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের প্রেজেন্টেশন স্কিল কোনো স্কেইলের মধ্যে নেই। প্রমাণ দিচ্ছি।
যারা আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন আপনার সকল শিক্ষকের কথা মনে পড়ে? সবার পড়ানো ভালো লেগেছে? সবার ক্লাসের জন্য অপেক্ষা করতে ইচ্ছে হতো? সবার ক্লাস কি অবাক হয়ে দেখতেন।
আপনার সকল শিক্ষককে অজান্তে ভালোবেসে ফেলেছিলেন? সব শিক্ষক কি সময় মতো ক্লাসে আসতো? অনেস্টি মেইনটেইন করে গ্রেইডিং করতো? সকল শিক্ষক কি আপনার ক্লাসের সকল শিক্ষার্থীকে সমান চোখে দেখতেন?
সকল শিক্ষক কি আপনাদের শাসন করতেন? (আমাদের এমবিএ ক্লাসে কানে ধরে দাড় করিয়ে রেখেছেন, অভিযোগ নয়, মনে পড়ে)। আমি জানি এই সব প্রশ্নের উত্তর আমার মতো বলবেন ‘না’, ’না’, ‘না’।
এবার বলুন তো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষক কি পড়াতে জানেন? যারা ৪র্থ থেকে ১০ম হবে তারাও খুব ভালো পড়াতে পারে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভুল আছে। একটু কমপিটিটিভ প্রক্রিয়ায় যেতে হবে।
শাসনের কথা বলছি। আমি তখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার হিসেবে ঢুকেছি। একটি ছেলে খুবই বান্দর টাইপের। একটু পরপর ওয়াশরুমে যায়। আর ইনকোর্স পরীক্ষা মিস করে, ঠান্ডা লেগেই থাকে। গোয়েন্দা লাগালাম ওর পেছনে।
রিপোর্ট দিলো, স্যার ও ওয়াশরুমে গিয়ে বার বার চুলে পানি দেয় চুল ঠিক করার জন্য। আমার খুব রাগ হলো। খুব কস্টলি একটি বিশ্ববিদ্যালয়। খুব মানসম্মতও বটে। শাসন করতে ইচ্ছে হলো।
আগে বুঝিয়েছি, কাজ হয়নি। সকল শিক্ষার্থীর সামনে ওক আলতো করে পিঠে একটা থাপ্পর দিলাম (আদর + শাসন) এবং বললাম, ’সি মি আফটার ক্লাস’। ও আসলো। বললাম দরজা বন্ধ করো। দুজনে কথা বললাম।
কাউন্সেলিং করলাম। স্বপ্ন বুনে দিলাম ওর মনের মধ্যে। ও প্রমিস করলো খুব ভালো করবে। দুজনে হাগ করলাম। ওর মনে হলো অনুপ্রাণিত হয়েছে। কেঁদে ফেলেসে ছেলেটি।
পরের সিমিস্টারে ও ফার্স্ট হলো। ওর ওয়াদা রাখলো। রেজাল্টের পর আমাকে জড়িয়ে ধরলো, বললো, “স্যার, লাভ ইউ, অনেক ধন্যবাদ”। ওর বাবাও খুশি।
আমি এরকম কিভাবে পারলাম? আমার ওই ২% সেরা শিক্ষকঃ ড. রিয়াজুর রহমান, ড. মুস্তফিজুর রহমান, শান্তি নারায়ন ঘোষ, প্রফেসর হামিদুর রহমান স্যারদের শাসন, ভালোবাসা, শিক্ষা থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে।
কেন ভাই, এমন শিক্ষক সবাই না কেন? তাহলে আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কে হতে বলেছে? কেন দেশের ইয়ুথদের ভবিষ্যত নষ্ট করছেন আপনি?
আরেকটি ব্যাপার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকদের মধ্যে ইগো দেখেছি। শয়তানের চেয়েও ইগো বেশি। শিক্ষার্থীদের সাথে ভাব নেন।
বলেন তার কত কিছু অর্জন। মনে হয় শিক্ষার্থীরাই হচ্ছে ইগো দেখানোর রাইট পিপল। মনে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিমেস্টারের কথা। আমরা ৪জন বন্ধু ডিন অনার্স মেরিট লিস্টে ছিলাম।
আমার একজন স্যারকে গিয়ে বললাম, স্যার আমরা পারফেক্ট সিজিপিএ পেয়েছি। উত্তর এলো, তো আমি কি করবো? কান্না এসেছিল.. একই খবর আরেকজন স্যারকে দিলাম, বললেন, গ্রেইট। কী খাবা বলো। কফি খাওয়াচ্ছি, বস। কি বুঝলেন।
শিক্ষকদের লেকচার ডেলিভারি নিয়ে কিছু কথা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, আমার অনেক বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছে। সত্যি বলছি ওদের অনেককে আমরা পাত্তাই দিতাম না।
আতেল মার্কা ও মুখস্তবিদ্যায় পারদর্শী ছিল ওরা। প্রেজেন্টেশন স্কিল ছোট বাচ্চাদেরও ধারে-কাছে নেই ওরা। তবে হ্যাঁ, কিছু বন্ধুরা আছে ওরা সত্যি অনেক ভালো। সেরাদের সেরা।
সবকিছুতে ভালো। ১% হবে আরকি। কেন ভাই, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ স্যারের মতো সুন্দর প্রেজেন্টার কেন নয় সকল শিক্ষকগণ? তাহলে শিক্ষার্থীরা শিখবে কি করে? বেকার তো থাকবেই। বেকারত্বের মূল একটি কারণ, শিক্ষকদের মান নেই।
শিক্ষকগণ আধুনিকতা থেকে অনেক দূরে। শাসন করছেন না। দায়সারা চাকরি করছেন। ভাই পারলে সেরা হন। শিক্ষার্থীরা আমাদের উপর নির্ভর করে, বিশ্বাস করে।
ওরা এটাই ধরে নেয় এই ডিগ্রীটি আমাকে একটি ভালো ক্যারিয়ার উপহার দেবে। আমরা খেলতে পারি না ওদের বিশ্বাস নিয়ে। একজন বেকারকে জিজ্ঞেস করুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে।
আবার এমনটিও দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর স্মার্টনেস ও প্রেজেন্টেশন স্কিল অনেক শিক্ষকের চেয়ে ভালো। সত্যি কথাটা বলে দেবে। অনেকের শুনতে এটা ভালো লাগবে না।
কেন শুনতে হচ্ছে ‘আমার সার্টিফিকেটের স্বাধীনত দিন অথবা ধ্বংস করে দিন সার্টিফিকেট তৈরির কারখানাগুলো’–মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকদের প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু কথা। এই বাংলাদেশে প্রাইমারিতে শিক্ষক হতে চাইলে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে? হয় না। ওয়াট এ সিস্টেম!
ইউসিজি’র উচিত ইউনিভার্সিটি টিচারস্ ট্রেইনিং ইনস্টিটিউট (ইউটিটিআই) লঞ্চ করা। মাস্টার্সের পর ২ বছর প্রশিক্ষণ নেবে, ডেমো ক্লাস হবে, রিসার্চ পেপার থাকবে নতুন জ্ঞান আবিষ্কার সহ, অনলি দেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন।
আরেকটি বিষয়! শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উচিত মাত্র ৫০০ জন বিদেশী শিক্ষককে উচ্চ বেতনে নিয়োগ দেয়া। যাদের দেখে দেশের শিক্ষকগণ আধুনিক হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ঢেলে সাজাতে হবে। ৫০% থিয়রি, ৫০% প্র্যাকটিক্যাল।
অথবা গোল্লায় যেতে বেশি সময় লাগবে না। যে সাব্জেক্ট এর চাকরি নেই, ওই সাব্জেক্ট পড়ানো স্টপ করেন।
সরকারের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণার সুযোগ করে দেয়া, বিদেশ থেকে ডিগ্রি নেবার সুযোগ দেয়া, বিশেষ করে হাই পেমেন্ট নিশ্চিত করা। তাহলেই আসবে পরিবর্তন। যারা ভালো শিক্ষক, হ্যাটস অফ।


