ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট লালন শাহের আখড়াবাড়ীতে তিনদিন ব্যাপী উৎসবের উদ্ধোধন

আসাদুর রহমান, কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি: লালন শাঁইজীর মাজার জিয়ারতে ১লা কার্তিক অন্তর্ধান দিবস বরণে কুষ্টিয়া ছেঁউড়িয়া গুরু বাড়ীতে তাঁর ভক্ত- অনুসারীরা এই মিলন মেলা মহাত্মা লালন শাঁইজী ওফাতের পর থেকে আয়োজন করে আসছেন।
এরই আলোকে আজকের প্রতিষ্ঠান রুপে দাঁড়ানো ‘লালন একাডেমি’ প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ০১, ০২ ও ০৩ কার্তিক ১৪৩২ (১৭, ১৮ ও ১৯ অক্টোবর ২০২৫) শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার ৩ (তিন) দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও লালন সংগীতানুষ্ঠানসহ গ্রামীন মেলা আয়োজন করেছেন।
জাতীয় পর্যায়ে এবারের অনুষ্ঠানে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে স্থানীয় লালন একাডেমির আয়োজনে অতিথিদের নিয়ে চলবে আলোচনা সভা।
উদ্ধোধনী দিনের আলোচনা সভায় আজ শুক্রবার বিকেলে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এ আয়োজনের শুভ উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী, বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণারয়ের সচিব মফিদুর রহমান, জেলা প্রশসাক ও লালন একাডেমীর সভাপতি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিনের সভাপতিত্বে মুখ্য আলোচক থাকবেন আন্তজার্তিক খ্যাতিমান লেখক গায়ত্রী চক্রবর্তি স্পিভাক, অনুষ্ঠানে আলোচক থাকবেন বিশিষ্ট চিন্তক ও গবেষক ফরহাদ মজহার। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখবেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আল মামুন।
দ্বিতীয় দিনের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, মুখ্য আলোচক থাকবেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. রশিদুজ্জামান, অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখবেন কুষ্টিয়া-৪- আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, কুষ্টিয়া-৩- আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব উদ্দিন, জেলা বিএনপির আহবায়খ কুতুব উদ্দিন আহমেদ, সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিন।
তৃতীয় ও সমাপনি দিনে জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফিনের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব মোঃ ফিরোজ সরকার, অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক থাকবেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ( আইইআর) অধ্যাপক ড. মোঃ খালিদউজ্জামান, ডিআইজি রেজাউল হক পিপিএম, কুষ্টিয়া বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল আহসান হাবীব পিএসসি, জি, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান।
উদ্ধোধনী দিনে বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী ফরিদা পারভিনের স্বরণে একটি তথ্য চিত্র প্রদর্শন এবং প্রতিদিন আলোচনা সভা শেষে লালন একাডেমীর আয়োজনে চলবে লালন সংগীতের আসর।
আলোচনা শেষে লালন একাডেমির শিল্পীদের নিয়ে চলবে লালন সংগীতানুষ্ঠান।পাশাপাশি লালন একাডেমির খোলা মাঠে বসছে গ্রামীণ মেলা।
মরমী সাধক লালন শাঁইজী মানবকূলে বিদায়ের পর থেকে কুষ্টিয়া শহর সংলগ্ন ছেঁউড়িয়া মাজার চত্বরে তাঁর ভক্ত ও আশেকানদের ১ লা কার্তিক অন্তর্ধান দিবস বরণের মিলন মেলা উদযাপিত করে আসছে।
লালন অনুসারীরা দিনটি উপলক্ষে আগেই বহু দুর থেকে দলে দলে সকল ভক্ত ও আসেকানদের ভিড় জমে উঠে ছেঁউড়িয়া লালন শাঁইজীর নিজ বাসভবনে। লালন শাঁইজীর মাজারের চারিপাশে ভক্তরা নানা সাজে মেতে উঠে ভক্তি প্রদানে।
তাঁর ভক্ত-অনুসারীরা অনেকেই আগে থেকেই গুরু বাড়িতে এসে গুরুর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনে, বিভিন্ন ধরনের সেবাদানে এবং আগরবাতি, মোমবাতি, আতর, ফুল দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠে।
ভক্তরা গুরুর বাণী ও গান শ্রদ্ধাার সাথে শ্রবণ করে অতঃপর অনেকে গান গেয়ে মাজারের আশপাশে আাসা সবার মাঝে গুরু বাণী প্রচারের আসর জমিয়ে তুলে।
এরই আলোকে ১লা কার্তিক লালন শাঁইজীর ভক্ত-অনুসারীরা তাঁদের মতে মিলন মেলার অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।
লালন অনুসারী ও ভক্তরা গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি প্রদানের মধ্য দিয়ে গুরুর বাণী ও গান প্রচারের দাওয়াত দিয়ে থাকেন।
গুরু পাঠ নিয়ে গুরু সেবার মাধ্যমে নিজেকে একজন প্রকৃত মানুষ হওয়াই এই পথের মূল লক্ষ্য।
লালন দর্শন মতের জানা গেছে, গুরুর হাতে বায়েত গ্রহণ করে সৃষ্টি ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি-ভালবাসার দিয়ে সন্তুষ্টি অর্জন করা।
সকল ধর্মের নারী-পুরুষ সবাইকে একজন গুরুর দীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। লালন সাঁইকে তার শিষ্যদের কাছে ‘সাঁইজি’ নামে পরিচিত।
ফকির লালন সাঁইকে আমরা যাকে লালন শাহ, মহাত্মা লালন, মরমি কবি ফকির লালন সাঁই, বাউল সম্রাট, মরমি সাধকসহ একাধিক নামেও চিনি।
লালন জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণ, গোত্রের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানুষ ও মানবতাকে বড় করে দেখেছেন। তাঁর পথচলা প্রথম জীবন শুরু হয়েছে রাধা-কৃষ্ণ ও কালী প্রেম দিয়ে। মাঝ জীবনে গেয়েছেন দেহ তত্ত্বের গান।
শেষ জীবনে ঝুকে ধরেছেন নবী রসূলের দিকে। হিন্দু ও ইসলাম ধর্মের সমন্বয়ে লেখা গানগুলো অধিকাংশ ইসলাম, সুফিবাদ ও দেহতত্ত্ব নিয়ে। তিনি লিখেছেন, পারে কে যাবি নবির নৌকাতে আয়।
রুপ কাঠের ই নৌকাখানি নাই ডুবার ভয়। আরো লিখেছেন, যে মুর্শিদ সেই তো রাসুল, ইহাতে নাই কোন ভুল, খোদাও সে হয়।
লালন কয় না এমন কথা কোরানে কয়। মানুষ ছেড়ে ক্ষেপা রে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার, আগে কপাট মার কামের ঘরে, মানুষ ঝলক দিবে রুপ নিহারে গানসহ লালন সাঁইজী আরো লিখেছেন সামাজিক ভেদনীতি, শ্রেণী-বৈষম্য, জাতপাতের কলহ ও সাম্প্রদায়িক বিরোধের বিরুদ্ধে লেখা।
উল্লেখ্য, বৃটিশ শাসকগোষ্ঠির নির্মম অত্যাচারে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবনকে যখন বিষিয়ে তুলেছিল, ঠিক সেই সময়ই সত্যের পথ ধরে,মানুষ গুরুর দিক্ষা দিতেই সেদিন মানবতার পথ প্রদর্শক হিসাবে মরমী সাধক লালন শাহের আবির্ভাব ঘটে ছেঁউড়িয়াতে।
লালনের জন্মস্থান নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকলেও আজো অজানায় রয়ে গেছে তাঁর জন্ম রহস্য। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।
তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। তবে তিনি ছিলেন স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত। যৌবনকালে পূর্ণ লাভের জন্য তীর্থ ভ্রমনে বেরিয়ে তার যৌবনের রূপামত্মর ও সাধ।


