ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেবে সরকার

নতুন অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে চায় সরকার, যা জিডিপির ১ দশমিক ৬৪শতাংশ।
বিদায়ী অর্থবছরে মূল বাজেটে এ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে ১ লাখ ১৮ হাজার হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গতবারের মূল বাজেটের চেয়ে এবার ব্যাংক থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। তবে সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা কম ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিকালে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এই ব্যয়ের মধ্যে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব বাবদে আয় করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন। সে হিসাবে আয় ও ব্যয়ের সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ৩.৬ শতাংশের সমান।
ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ছাড়াও সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধন করে তা বাড়িয়ে ধরা হয় ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
এবার ঘাটতি পূরণে সরকার বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা ঋণ নিতে চায়, যা জিডিপির ২ দশমিক ২৮ শতাংশ।
বিদায়ী অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক ঋণ খাতে ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধনের পর যা কমে দাঁড়ায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা ও সরকারি অর্থ খরচ কমিয়ে আনতে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দেয়। তবে শেষের দিকে এসে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ১৬১ কোটি টাকা ঋণ নেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, বিদায়ী আর্থিক বছরের ১১ মাসে, অর্থাৎ জুলাই-মে সময়ে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ২৩ কোটি টাকা নিয়েছে সরকার।
অর্থনীতিবিদরা বলে থাকেন, ব্যাংক খাত থেকে সরকার ঋণ বেশি নিলে বেসরকারি খাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা ঋণ কম পান। তাতে দেশের উৎপাদন কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান নিয়ামক বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে একেবারে তলানিতে, ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে; যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
চলতি অর্থবছরের নবম মাস মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৪৩ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
এর মানে হচ্ছে, চলতি বছরের মার্চে গত বছরের মার্চের চেয়ে ৪ দশমিক ৭২ দশমিক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুদহার বিবেচনায় নিলে প্রকৃতপক্ষে প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক (-)। কেননা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হিসাব করা হয় সুদহার যোগ করে।
গত মার্চে ব্যাংকগুলো গড়ে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণ করেছে। আমানতের গড় সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ঋণ ও আমানতে সুদহারের গড় ব্যবধান (স্প্রেড) ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ঋণস্থিতির হিসাব হয় সুদসহ। ফলে প্রকৃতপক্ষে ঋণ না বাড়লেও কেবল সুদ যোগ হয়ে স্থিতি বেড়ে সামান্য হলেও প্রবৃদ্ধি হয়।
“বেসরকারি ঋণে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসলে দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি। এর আগে এত কম প্রবৃদ্ধি কখনই হয়নি।”
কোভিড মহামারীর কারণে ২০২০ সালে বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ানি-জুন) মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা আছে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। সেখানে মার্চ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ।
এদিকে মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার বাড়িয়ে বেসরকারি ঋণে লাগাম দিলেও তার সুফল মেলেনি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, গত মে মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ।
অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ার মানে হলো ব্যবসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমে যাবে। সেই সঙ্গে কমবে নতুন শিল্প স্থাপন বা শিল্প সম্প্রসারণের গতি। অবধারিতভাবে তার প্রভাব পড়বে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে।












