মিছিলের রাজপথ থেকে নেতৃত্বের মঞ্চে মির্জা ফয়সল আমীন

জাহাঙ্গীর আলম, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: শৈশব কেটেছে যুদ্ধের আতঙ্কে, জীবনের একাংশ দেখেছে শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা। ছোট্ট ঘরে পরিবারের সঙ্গে থাকা, অভাবের সংসারে মায়ের কয়লা ভেঙে রান্নার জ্বালানি জোগাড় এবং সবার ছোট সন্তান হিসেবে এক পোয়া দুধের জন্য আলাদা যত্ন এসব স্মৃতি পেরিয়েই বেড়ে উঠেছেন মির্জা ফয়সল আমীন।
পরে ছাত্ররাজনীতি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক মামলা, বিদেশজীবন ও ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথচলায় গড়ে ওঠে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়।
১৯৬৩ সালে ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায় মির্জা রুহুল আমিন (চখামিয়া) ও ফাতেমা বেগম দম্পতির ঘরে জন্ম নেন তিনি।
সাত ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট ফয়সল আমীনের বাবা ছিলেন শিক্ষক, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী। পীরগঞ্জ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ও ঠাকুরগাঁও হাইস্কুলের শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান ও ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। পরে বাংলাদেশ সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও হন।
তবে এমন রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচিতির পরিবারে জন্ম হলেও ফয়সল আমীনের শৈশব ছিল না স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধের আগে নিরাপত্তার কারণে পরিবার নিয়ে প্রথমে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লীর বালিয়ায় আত্মীয়ের বাড়ি, পরে পঞ্চগড়ের মির্জাপুর এবং সেখান থেকে রানীশংকৈলের বনগাঁয়ে নানাবাড়িতে আশ্রয় নেন তাঁর বাবা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ছোট সন্তানদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পরিবার নিয়ে ভারতে চলে যান মির্জা রুহুল আমিন। ইসলামপুরে শরণার্থী হিসেবে ছোট একটি ঘরে দিন কাটে তাঁদের। খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী।
মা ফাতেমা বেগমকে রান্নার জন্য কয়লা ভাঙতে হতো। পরিবারের চাচারাও সঙ্গে ছিলেন। সবার ছোট হওয়ায় ছোট্ট ফয়সলের জন্য এক পোয়া দুধ সংগ্রহের চেষ্টা করা হতো।
অন্যদিকে পরিবারের বড় ছেলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ঘরছাড়া। একদিকে যুদ্ধের ময়দানে ভাই, অন্যদিকে ভারতে শরণার্থী বাবা-মা ও ভাই-বোন এই বাস্তবতার মধ্যেই কেটেছে ফয়সলের শৈশব।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে পরিবারটি দেখতে পায়, বাড়িঘর ও সম্পদের অনেক কিছু লুট হয়ে গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী তাঁদের বাড়ির মালামাল নিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনরত যোদ্ধাদের যাতায়াতের জন্য পরিবারের নিজস্ব পেট্রোল পাম্প থেকে বিনামূল্যে জ্বালানি দিয়েছিলেন তাঁর বাবা; পরে অবশিষ্ট সম্পদও পাকিস্তানি সেনারা লুট করে নেয়।
ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবন পুনর্গঠনের পাশাপাশি শুরু হয় ফয়সলের শিক্ষা ও রাজনীতির পথচলা। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন।
উচ্চমাধ্যমিক শেষে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রজীবনেই ছাত্রদলের রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হন। জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থী হলেও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতেন।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও ছাত্রদলের সঙ্গে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। একই সময়ে বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গৃহবধূর জীবন থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠার সময়কার নানা স্মৃতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
পড়াশোনা শেষে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি নেন এবং চাকরির পাশাপাশি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। কয়েক বছর পর চাকরি ছেড়ে বিয়ে করে সংসার শুরু করেন।
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের দিনই প্রথম কন্যাসন্তানের বাবা হন তিনি। পরে রাজধানীর কর্মজীবন ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে ফিরে যুবদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন।
১৯৯৬ সালে বিএনপি নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তাঁর বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা হয়। প্রতিটি মামলায় তাঁকে এক নম্বর এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দুই নম্বর আসামি করা হয়।
একপর্যায়ে কয়েক বছরের জন্য বিদেশে গিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সেখানেও প্রবাসী যুবদলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দেশে ফিরে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সহসভাপতি হন।
ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় হয়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় বিএনপির মনোনয়নে ধানেরশীষ প্রতীকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে মেয়র নির্বাচিত হন।
মেয়র থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তাঁর অফিসের টেবিলে ফ্রেমে খালেদা জিয়ার ছবি রেখে দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে বিএনপির আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকায় জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাঁর একক উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠে ঠাকুরগাঁওয়ের নিশ্চিন্তপুর থিয়েটার।
প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আলদীনের সরাসরি ছাত্র লিটু আনাম গ্রামথিয়েটার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর হাত ধরেই নাট্যজীবন শুরু করেন। ফলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও পরিচিতি তৈরি হয় তাঁর।
শরণার্থী জীবনের কষ্ট, যুদ্ধের স্মৃতি, স্বাধীনতার পর শূন্য হাতে ঘরে ফেরা, বাবার নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়া, ছাত্রদলের রাজনীতি, নব্বইয়ের গণআন্দোলনের রাজপথ, ব্যাংকের চাকরি, সংসার, মামলা, বিদেশজীবন জীবনের নানা বাঁক পেরিয়েছেন মির্জা ফয়সল আমীন।
নিজের রাজনৈতিক জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, রাজনীতির সঙ্গে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। বাবার সঙ্গে নির্বাচনী মাঠে ঘুরেছি, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁর জন্য ভোট চেয়েছি।
তখন রাজনীতির গভীরতা বুঝতাম না, কিন্তু মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছি। পরে ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হই।
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে মিছিল-মিটিং করেছি। জীবনের নানা সময়ে মামলা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও প্রবাসজীবন এসেছে। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিই আমাকে মানুষের কাছ থেকে দূরে রাখতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজনীতি করতে গিয়ে অনেক কিছু পেয়েছি, আবার অনেক কিছু হারিয়েছিও। তবে মানুষের পাশে থাকার যে শিক্ষা বাবা ও বড়












