ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তিতে জবির বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা

আপডেট: August 29, 2026 |
print news

দীপ্ত, জবি প্রতিনিধি: রাজধানী ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ঢাকা দিবস ২০২৬-হৃদয়ে ঢাকা’ উদ্‌যাপনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শোভাযাত্রায় পুরান ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও লোকজ জীবনধারার নানা অনুষঙ্গ প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীনের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা এতে অংশ নেন।

শোভাযাত্রায় ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন, রেজিস্ট্রার, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ইনস্টিটিউটের পরিচালক, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, বিভিন্ন দপ্তরের পরিচালক, শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ ও প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতির নেতৃবৃন্দ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল, বিভিন্ন ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ, বিএনসিসি ও রোভার স্কাউটের সদস্যরাও অংশ নেন।

এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জসহ পুলিশের সদস্যরা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।

ঢাকার ৪১৬ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে শোভাযাত্রায় পুরান ঢাকার নানা প্রতীকী উপস্থাপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। বড় আকারের স্টিমার, বাকরখানি, জিলাপি, ঘুড়ি ও নাটাইয়ের প্রতিকৃতি অংশগ্রহণকারী ও পথচারীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এসব প্রতিকৃতির মাধ্যমে পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতি, বিনোদন, লোকজ জীবন ও ঐতিহাসিক নগরজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।

শোভাযাত্রায় ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার প্রতিকৃতিও প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ছিল লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, লালকুঠি, তারা মসজিদ, ঢাকেশ্বরী মন্দির, বৌদ্ধ মন্দির ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা গেট।

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতির নানা উপকরণও শোভাযাত্রায় তুলে ধরা হয়। বাকরখানি, নান্না বিরিয়ানি ও বিউটি লাচ্ছির প্রতিকৃতির পাশাপাশি অতীতের যাতায়াতব্যবস্থার স্মৃতিবাহী স্টিমার, ঘোড়ার গাড়ি ও পালকির প্রদর্শনী পথচলতি মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করে।

শোভাযাত্রাটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঢাকার পত্তন ও বিকাশের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের রূপায়ণ। রানি ভিক্টোরিয়া, নবাব খাজা আহসানউল্লাহ, নিকোলাস পোগোজ ও পরিবিবিসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক চরিত্রের আদলে সাজা অংশগ্রহণকারীরা নগরীর অতীত ইতিহাসকে জীবন্ত করে তোলেন।

এদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শোভাযাত্রায় ভিন্নমাত্রা যোগ করে। সংগীত ও নাট্যরূপের মাধ্যমে পুরান ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিভিন্ন দিক উপস্থাপন করা হয়। শিল্পী ও শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় পুরো শোভাযাত্রাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্‌দীন বলেন, “এটা হলো আমাদের প্রাণের উচ্ছ্বাস। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সংগীত ও নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা পুরান ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহ্য তুলে ধরেছে এই র‍্যালিতে। পুরান ঢাকার বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই র‍্যালি শুরু হওয়াটা আমাদের জন্য গর্বের। এই আয়োজন শুধু পুরান ঢাকায় নয়, পুরো বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে।”

শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে বাহাদুর শাহ পার্ক, কোর্ট চত্বর, রায়সাহেব বাজার ও গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট হয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে গিয়ে শেষ হয়।

নগর ভবনে শোভাযাত্রা শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, ঢাকার প্রতি নাগরিকদের ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতেই এ আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে নগরবাসী এবং বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে মাসব্যাপী ‘হৃদয়ে ঢাকা ৪১৬’ উৎসবের সূচনা করা হয়েছে।

তিনি এ আয়োজনে নগরবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন।

শোভাযাত্রার পুরো পথজুড়ে রাস্তার দুই পাশে নানা বয়সী মানুষের ভিড় দেখা যায়। বর্ণিল পোশাকে অংশ নেওয়া তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে পুরো পুরান ঢাকা যেন এক প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত হয়।

আয়োজকদের মতে, ঢাকা বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশেষ করে পুরান ঢাকা শত শত বছরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ধারণ করে আছে। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং তা সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।

উল্লেখ্য, ঢাকার ৪১৬ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য স্মরণ, সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে ‘ঢাকা দিবস ২০২৬—হৃদয়ে ঢাকা’ উদ্‌যাপন করা হচ্ছে। এ আয়োজনের মাধ্যমে রাজধানীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ঢাকার ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর