গত বছর সড়কে ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত

আপডেট: January 14, 2024 |
print news

২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭হাজার ৯০২ জন নিহত, ১০ হাজাত৩৭২ জন আহত হয়েছে। একই সময় রেলপথে ৫২০ টি দুর্ঘটনায় ৫১২ সমানিয়ত, ৪৭৫ জন আহত হয়েছে। নৌ-পথে ১৪৮ ৯১ জন নিহত ১৫২ জন আহত এবং ১০৯ জন নিখোঁজ রয়েছে। একই সময়ে ২ হাজার ৩১ টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১৫২৮ নিহত ও ১ হাজার ৩৩৯জন আহত হয়েছে। যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ দশমিক ৪৩ শতাংশ, নিহতের ২৭ দশমিক ২৩ শতাংশ ও আহতের ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ।

সড়ক, রেল ও নৌপথের সর্বমোট ৬ হাজার ৯২৯টি দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫০৫জন নিহত এবং ১০ হাজার ৯৯৯ জন আহত হয়েছে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।

আজ (রোববার) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি সাগর-রুনি মিলনায়তনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই প্রতিবেদন তুলে ধরেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সড়ক, বেল ও নৌ-পথে দুর্গটিনার সংবাদ মনিটরিং করে প্রতিবছরের ন্যায় এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। বিগত নয় বছরে নিবন্ধিত যানবাহনের পাশাপাশি ছোট যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও ত্রি-দুইলার সরকারের নিষেবাজ্ঞা অমান্য করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে অবাধে চলাচলের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে।

মোজাম্মেল হক বলেন, সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ১৯৫০ জন চালক, ৯৬৮ জন পথচারী, ৪৮৫ জন পরিবহন শ্রমিক, ৬৯৭ জন শিক্ষার্থী, ৯৭ জন শিক্ষক, ১৫৪ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৯৮৫ জন নারী, ৬১২ জন শিশু, ৩০ জন সাংবাদিক, ৩২ জন চিকিৎসক, ১৬ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ০৮ জন আইনজীবী ও ১০ জন প্রকৌশলী এবং ১১১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।

এর মধ্যে নিহত হয়েছে ৭৩ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ১৬ জন সেনা সদস্য, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, এক র‍্যাব সদস্য, সাত জন বিজিবি সদস্য, ০৩ জন নৌ-বাহিনীর সদস্য, ০৩ জন আনসার সদস্য, ০২ জন ফায়ারসার্ভিস সদস্য, ০১ জন এনএসআই সদস্য, ১৩ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ১৫ জন সাংবাদিক, ৬৪৭ জন নারী, ৪৬৬ জন শিশু, ৪১৬ জন শিক্ষার্থী, ৮১ জন শিক্ষক, ১৫২৬ জন চালক, ২৬০ জন পরিবহন শ্রমিক, ০৮ জন প্রকৌশলী, ০৭ জন আইনজীবী, ৭৭ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, ২২ জন চিকিৎসক।

এ সময়ে সংগঠিত দুর্ঘটনায় সর্বমোট ৮৫৫০টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে, যার ১৬.১৫ শতাংশ বাস, ২৪.৮৪ শতাংশ ট্রাক-পিকাপ- কাভার্ডভ্যান ও লরি, ৫.৯১ শতাংশ কার-জীপ-মাইক্রোবাস, ৫.৩৯ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ২৬.০২ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৪.৪৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিক্সা ও ইজিবাইক, ৭.১৯ শতাংশ নছিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।

২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে দুর্ঘটনায় সংগঠিত যানবাহনের ১১.২২ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিক্সা-ভ্যান-ইজিবাইক, ২.৮২ শতাংশ বাস সড়কে দুর্ঘটনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া ২৪.৩৬ শতাংশ কার-জীপ-মাইক্রোবাস, ২৩.২২ শতাংশ নসিমন-মাহিন্দ্রা-লেগুনা, ২০.০০ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ১৯.০৯ শতাংশ মোটরসাইকেল, ৯.৮৪ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-লরি সড়কে দুর্ঘটনা বিগত বছরের চেয়ে কমেছে।

সংগঠিত মোট দুর্ঘটনার ৫২.৮৩ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা, ২০.৫ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৪.২৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, ১১.৪ শতাংশ বিবিধ কারনে, ০.২৭ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁছিয়ে এবং ০.৬৮ শতাংশ ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত ২০২২ সালের তুলনায় বিদায়ী ২০২৩ সালে ৬.৭৩ শতাংশ গাড়ি চাপা, ১১.৯৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩৭.০৩ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেছিয়ে, ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ৩৫.০২ শতাংশ, ১৬.০৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা কমেছে। এছাড়া বিবিধ কারণে ১৮.৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনা বেড়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে এইবছর মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩৪.৮৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৮.৪১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮.৫ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়াও সারাদেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার ৬.৩২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১.১১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, ০.৬৮ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।

বিগত বছরের চেয়ে বিদায়ী বছরে ছোট যানবাহনের সংখ্যা হঠাৎ কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়া ও এসব যানবাহন অবাধে চলাচলের কারনে ফিভার রোডে ৫৫.১৯ শতাংশ, জাতীয় মহাসড়কে ১৪.৩৩ শতাংশ, রেলক্রসিং-এ ০.১৬ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এবার আঞ্চলিক মহাসড়কে ৪৯.৩৩ শতাংশ দুর্ঘটনা কমেছে।

কোন বিভাগে কত

২০২৩ সালে ঢাকা বিভাগে ১৭৩৬ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১৭১২ জন নিহত, ২৩৮১ জন আহত হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ১২৩৩ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২০৫ জন নিহত, ২২৯৪ জন আহত হয়েছে। খুলনা বিভাগে ৭৬৫ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৬৪ জন নিহত,১০৭৮ জন আহত হয়েছে। বরিশাল বিভাগে ৩৮১ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭৯ জন নিহত, ৯৯২ জন আহত হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে ৪১৮ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৪ জন নিখুঁত, ৬৬৫ জন আহত হয়েছে। সিলেট বিভাগে ৩৭১ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৩ জন নিহত, ৯২৬ জন আহত হয়েছে। রংপুর বিভাগে ৫৬ম টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২৬ জন নিহত, ৬৬নিভানো ৩২১ হয়েছেন রাজশাহী বিভাগে ৭৮৮ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৯৩ জন নিহত, ১১৬৮ জন আহত হয়েছে।

বিদায়ী বছরে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে ১৭ জানুয়ারী, এইদিনে ৩৫ টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ৩১ জন আহত হয়েছে। ২৬ মার্চ সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা সংগঠিত হয়েছে, এইদিনে ৩৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ০৮ জন নিহত ও ১৪ জন আহত হয়েছে। দুর্গটনায় সবচেয়ে থেনি নিয়ত হয়েছে ৩৭ জুলাই, এইদিনে ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত ও ৯৮ জন আহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে ০৪ মার্চ, এইদিনে ২৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯ জন নিহত ও ১৪৮ জন আহত হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণসমূহ:

১। বেপরোয়া গতি। ২। বিপদজনক অভারটেকিং। ৩। রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি। ৪। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল। ৫। যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা। ৬। চালকের অদক্ষতা। ৭। যানবাহন চালক ও মালিকের বেপরোয়া মনোভাব। ৮। চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার। ৯। মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো। ১০। বেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা। ১১। রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা। ১২। ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ। ১৩। ট্রাফিক আইন অমান্য করা ১৪। ছোট যানবাহনের ব্যাপক বৃদ্ধি। ১৫। সড়কে চাঁদাবাজি। ১৬। রাস্তার উপর হাট-বাজার। ১৭। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চালানো। ১৮। মালিকের অতিরিক্ত মুনাফার মানসিকতা। ১৯। চালকের নিয়োগ ও কর্মঘন্টা সুনির্দিষ্ট না থাকা। ২০। সড়কে আলোকসজ্জা না থাকা। ২১। রোড ডিভাইডার পর্যান্ত উচু না থাকা। ২২। সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর দ্বায়িত্বরত প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি না থাকা। ২৩। দেশব্যাপী নিরাপদ, আধুনিক, স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে টুকটুকি-ইজিবাইক-ব্যাটারিচালিত রিকশা, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা নির্ভর গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার কারনে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানী বেপরোয়াভাবে বাড়ছে।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সুপারিশমালা:

১. করোনার চেয়ে ভয়াবহ মহামারি বিবেচনায় সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার প্রকল্পে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি অর্ন্তভুক্ত করা।

২. নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা। ৩

৪ . সড়ক নিরাপত্তায় বাজেট বরাদ্ধ বাড়ানো, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে গঠিত সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট শক্তিশালী করা। . সড়ক নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে প্রণীত যাবতীয় সুপারিশমালা বাস্তবায়ন

করা। ৫. দেশের সড়ক-মহাসড়কে রোড সাইন, রোড মার্কিন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা। জেব্রা ক্রসিং অংকন ও আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা।

৬. গণপরিবহন চালকদের যুগউপযোগী পেশাদার ট্রেনিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা।

৭. সড়ক পরিবহন সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্টা করা। অনিয়ম-দুর্নীতি ও চাদাবাজি বন্ধ করা।

৮. গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন করা। ৯. সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক সহায়তা তহবিলে আবেদনের সময়সীমা ৬ মাস নির্ধারণ করা।

১০. স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী পর্যাপ্ত মানসম্মত নতুন বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেয়া।

১১. ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা ও সদস্যদের প্রশিক্ষণের জন্য ট্রাফিক ট্রেনিং একাডেমী গড়ে তোলা।

১২. উল্টো পথের আলো এবং পথচারীর পারাপার রোধে মহাসড়কের রোড ডিভাইডার পর্যাপ্ত উচু করা।

১৩. গণপরিবহনে সেবা ও নিরাপত্তার মান পর্যবেক্ষণের জন্য মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সচিব, জেলা প্রশাসকদের প্রতিমাসে
একদিন পরিচয় গোপন রেখে গণপরিবহন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।

১৪. পরিবহনের প্রধানতম স্টেকহোল্ডার ১. মালিক ২. শ্রমিক ৩. যাত্রী ৪. সরকার হলেও দীর্ঘদিন যাবত এই সেক্টরে ভাড়া নির্ধারণ, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণসহ যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিক-সরকার মিলেমিশে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারনে যাত্রী হয়রানী, ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়কে দুর্ঘটনা বেপরোয়া হারে বাড়ছে। খেসারত দিচ্ছে দেশের সাধারন মানুষ। যাত্রী সাধারনের মতামত ও অংশগ্রহন ব্যতিরেখে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ফলে এই সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। কোন কোন সময় সরকার অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে। ফলে কতিপয় মালিক শ্রমিক নেতাদের হাতে এই সেক্টর দীর্ঘদিন যাবৎ জিম্মি দশায় রয়েছে।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর