“যে দেয়াল মৃত্যুর কথা বলে”

আপডেট: April 25, 2025 |
print news

আমিনা হোসাইন বুশরা, জাবি প্রতিনিধি: ২৩ এপ্রিল, ২০১৩। ঢাকার অদূরে সাভারের একটি বহুতল ভবন, রানা প্লাজা। দেশে চলছে হরতাল।

দোকানপাট, অফিস আদালত মন্থর। কিন্তু শ্রমিকদের নেই ছুটি। সাভারের রানা প্লাজায় তখনো চলছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাজ।

হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমের মধ্যেই হঠাৎ পিলারগুলো থেকে কানে ভেসে এলো কেমন চড়চড় শব্দ। ভয়ে তটস্থ সবাই। নয়তলা ভবনের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল।

মাঝেমধ্যেই মৃদু কেঁপে উঠছে যেন মানুষের ভারে। কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো। আদেশ আসলো এত চাপের মধ্যে কাজ বন্ধ রাখা যাবে না।

ভবনের কোন ঝুঁকি নেই। ইঞ্জিনিয়ারের সাথে যোগাযোগ হয়েছে। যথারীতি কাজ শেষে বাড়ি ফিরলেন সবাই।

পরের দিন। ২৪ এপ্রিল,২০১৩। এদিনও হরতাল। বেশ ক’জন শ্রমিক ভবনের সামনে দাড়িয়ে প্রবেশ করতে দ্বিধা করছেন। এদিক সেদিক ইতস্তত ঘোরাঘুরি করছেন।

এক অজানা আতঙ্ক যেন তাদের গ্রাস করছে। আর্থিক টানাপোড়েনকে যেন বিশাল পোশাক শিল্পের কিছু মালিক ব্যবহার করে বড় এক সাপের আকৃতিতে তাদের ছোবল দেয়ার জন্য মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই রানা প্লাজা নামক ভবনরুপে।

এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করতে এগিয়ে এলো কয়েকজন ঘোষক। তারা ঘোষণা করে বলছে শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে। ফ্লোরে মাইকিং করে বলা হচ্ছে, “ভবনটি ১৩ তলা ফাউন্ডেশন।

কেবল নয় তলা হয়েছে।আতঙ্কিত হবার কারণ নাই কোনও। আর যদি কোনও দুর্ঘটনা দেখা দেয়, আমাদের কমপ্লায়েন্সের লোক আছে চারিদিকে, তোমাদের দ্রুত বের হয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হবে।”

সবাই একে একে ঢুকে পড়ল প্লাজায়। শব্দ আর ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ আবার কেমন একটু শব্দ। আবার হালকা চরচরে শব্দ আর সামান্য কম্পন।

এরপর, কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় কারখানা মালিক, ভবন কর্তৃপক্ষ আর ভুয়া ইঞ্জিনিয়ারের সাজানো গল্প।

সব আশঙ্কাকে সত্যায়ন করে বিশাল নয় তোলা ভবন মাত্র কয়েক সেকেন্ডে ধ্বসে ধুলোয় পরিণত হয়ে যায়। রাস্তার ওপার থেকে দেখা যাচ্ছে শুধু একটা ধ্বংসস্তুপ আর উড়ন্ত কালো ধুলো।

শুরু হয় হাহাকার, আহাজারি, কান্নার রোল, এদিক সেদিক ছুটোছুটি, মানুষের আনাগোনা আর আর্মির উদ্ধার অভিযান। প্রিয়জনকে হারিয়ে বেদনায় মুর্ছা যান অনেকে।

তবুই স্বজনকে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বের করে আনা সম্ভব হয় না। ছেড়া, কিঞ্চিৎ নষ্ট হয়ে যাওয়া, মোবাইল ফোনে তোলা বা ছোটবেলার একটা ছবি নিয়েও অপেক্ষায় স্বজনেরা।

ছবি দেখিয়ে যেন সনাক্ত করতে পারেন প্রিয় স্বজনকে। জীবিত না হোক, মৃত অবস্থায়ও লাশটাকে অন্তত একবার জড়িয়ে ধরবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা।

একদিন, দুইদিন করে কেটে যায় ১৭ দিন। চলেছে উদ্ধার অভিযান, কাটাছেঁড়া। ততদিনে জমা হয়েছে সহস্রাধিক লাশ, কারো হাত কাটা, কারো বা দুটো পা।

কারো থেতলানো দেহটা হয়তো উদ্ধার হয়েছে কোনোভাবে। হাত কেটে, পা কেটে সামান্য বিস্কিট স্যালাইনের উপর বেঁচে থাকা বহু মানুষকে বের করে আনা হয়েছে ধ্বংসস্তূপ থেকে।

সেখানে হয়তো কারো ভবনের কোন এক গভীর অন্ধকারে কোণে বসে করা চিৎকার উদ্ধারকারীদের কানেও পৌঁছায়নি। কাতরাতে কাতরাতে ক্ষুধা তৃষ্ণায় ঢলে পড়েছে মৃত্যু মুখে।

এরপর, ১৭ তম দিনে হঠাৎ জীবিত উদ্ধার করা হয় রেশমা নামের এক মেয়েকে। দেশজুড়ে তোলপাড়, আরও তিনদিন উদ্ধার কার্যক্রম চালানোর পর আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্তি ঘোষনা করা হয় উদ্ধার অভিযানের। থেমে যায় এম্বুলেন্সের সাইরেন, কিন্তু থামেনা মৃত মানুষের গন্ধ।

বছরের পর বছর গড়িয়ে এবার রানা প্লাজা ট্রাজেডির এক যুগ। ট্রাজেডির পরে সরকার থেকে ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা, পুনর্বাসন, জীবন ধারণে সহায়তার আশ্বাস দেয়া হয়। অনেকেই পেয়েছেন, অনেকেই পাননি।

অথবা যা পেয়েছেন তা খুবই অপ্রতুল। এখনো বিচারের মুখ দেখেনি অপরাধীরা। ধ্বংসযজ্ঞের শিকার পঙ্গু, স্বজনহারা মানুষ পৃথিবীতে আজও একটু সাহায্যের অপেক্ষায়।

এখনও মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণা নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হয়তো তারা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। হয়তো শ্রেষ্ঠ সেই বিচারকের কাছে বিচার পাবার আশায় দিন গুণছেন তারা।

তারা হয়তো আজ নিশ্চুপ কিন্তু রানা প্লাজার ধ্বসে যাওয়া দেয়ালেরা আজও যেন ফিসফিসিয়ে মৃত্যুর কথা বলে, যেন সাক্ষী হয়ে রয়ে গেছে তারা।

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর