আইপিও বন্ধ, থমকে গেছে পুঁজিবাজার ও আর্থিক খাত —বাড়ছে অদৃশ্য বেকারত্ব

স্বপ্ন রোজ, নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও (Initial Public Offering) অনুমোদনের গতি দীর্ঘ সময় ধরে থমকে থাকায় এর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের মূল ধারার অর্থনীতিতে।
আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল বিনিয়োগের মন্দা মনে হলেও, বাজার সংশ্লিষ্ট বড় একটি অংশের মতে—এটি দেশের আর্থিক খাতের একটি বিশাল পেশাদার জনবলকে ‘অদৃশ্য বেকারত্ব’ এবং দীর্ঘমেয়াদী আয়ের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহ করা অপরিহার্য। তবে দীর্ঘস্থায়ী পুঁজি সরবরাহ (আইপিও) বন্ধ থাকার কারণে ভালো এবং সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলো মূলধন সংকটে পড়ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্প সম্প্রসারণের গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেমন লাভজনক খাতে অর্থ খাটানোর সুযোগ হারাচ্ছেন, তেমনি বাজারের গভীরতা ও তারল্য সংকটের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা এক প্রকার তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
আইপিও ইকোসিস্টেম ও পেশাদার খাতের বিপর্যয়।আইপিও না আসলে যে সব পেশাজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাদের একটি সম্পূর্ণ তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১.অডিটর
২. ইস্যু ম্যানেজার
৩. আন্ডাররাইটার
৪. প্রিন্টিং প্রেসের কর্মী
৫. ব্রোকার হাউজের কর্মকর্তা
৬. পোস্ট ইস্যু ম্যানেজার
৭. পুঁজিবাজারের সংবাদকর্মী
৮. ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান
৯. ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ
১০. নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও
১১. ব্যাংক খাত
পুঁজিবাজারের পরিভাষায় আইপিও কেবল একটি কোম্পানির বাজারে আসার প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি বিশাল ‘ফাইন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম’। একটি আইপিও চালুর সাথে সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সচল রাখতে ডজনখানেক বিশেষায়িত পেশাদার খাত কাজ করে। আইপিও বন্ধ থাকার অর্থ হলো এই চেইনের সাথে যুক্ত প্রতিটি খাতের রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ধস নামা:-
মার্কেট ইন্টারমিডিয়ারিজ (ইস্যু ও পোস্ট-ইস্যু ম্যানেজার এবং আন্ডাররাইটার): আইপিও প্রক্রিয়াকরণ এবং এর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান আয়ের উৎস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে কর্মী ছাঁটাই বা অন্য খাতে মনোযোগ দেওয়ার কথা ভাবছে। এমনি কোন কোন প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
বিশেষায়িত মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা (অডিটর এবং ভ্যালুয়ার): আইপিও-তে আসতে চাওয়া কোম্পানিগুলোর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার জন্য যে বিশাল কাজের ক্ষেত্র ছিল, তা এখন সংকুচিত। ফলে অভিজ্ঞ অডিট ও ভ্যালুয়েশন ফার্মগুলো বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে।
সহায়ক ও প্রযুক্তি খাত (ব্রোকার হাউজ ও প্রিন্টিং প্রেস): আইপিও আবেদনের মাধ্যমে ব্রোকার হাউজগুলোর নতুন বিও (BO) অ্যাকাউন্ট খোলার এবং প্রাথমিক তারল্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ বন্ধ। অন্যদিকে, প্রসপেক্টাস ও বিশাল নথিপত্র মুদ্রণের সাথে জড়িত বিশেষায়িত প্রিন্টিং প্রেসের শত শত কর্মী সরাসরি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
আর্থিক ঝুঁকি বিশ্লেষক ও সংবাদমাধ্যম (ক্রেডিট রেটিং ): নতুন কোম্পানির ক্রেডিট রেটিং করার বাণিজ্যিক সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় রেটিং এজেন্সিগুলোর প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। এছাড়াও পাশাপাশি, পুঁজিবাজারের সংবাদের পরিধি ছোট হয়ে আসায় আর্থিক খাতের সংবাদকর্মীদের পেশাগত বিকাশও বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
প্রাতিষ্ঠানিক স্থবিরতা ও রাজস্ব ক্ষতি: আইপিও না থাকার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওপর। নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তি ফি এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব সংক্রান্ত বড় ধরনের লেনদেন ফি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক্সচেঞ্জের নিজস্ব আইটি, অপারেশনস ও মনিটরিং বিভাগের কার্যক্রমে এক ধরনের অলসতা বা স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এমনকি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) আইপিও তদারকি ও অনুমোদন সংক্রান্ত বড় একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ক্ষেত্র এখন নিষ্ক্রিয়।
ব্যাংক খাত ও তারল্য ব্যবস্থাপনা (Banking Sector & Escrow Services): আইপিও প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অত্যন্ত প্রত্যক্ষ ও গভীর। আইপিও-তে আবেদন করা বিনিয়োগকারীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখার জন্য ব্যাংকগুলোতে ‘এসক্রো অ্যাকাউন্ট’ (Escrow Account) খোলা হয়।
আইপিও বন্ধ থাকার অর্থ হলো ব্যাংকগুলোর এই বিশাল অংকের ‘স্বল্পমেয়াদী কম-খরচের তহবিল’ (Low-cost funds) বা ফ্লোট মানি (Float Money) পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হওয়া, যা তাদের তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতো।
এছাড়া, আইপিও-র মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে অনেক কোম্পানি তাদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করে থাকে; আইপিও থমকে থাকায় ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় বা নন-পারফর্মিং লোন (NPL) কমানোর প্রক্রিয়াও বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি গতিশীল পুঁজিবাজারের প্রধান শর্ত হলো নিয়মিত মানসম্পন্ন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি। বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই অদৃশ্য বেকারত্ব ও কাঠামোগত সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আইপিও প্রক্রিয়ার জটিলতা দূর করে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং দ্রুত অনুমোদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যথায়, আর্থিক খাতের এই পেশাদার জনবলের বড় একটি অংশ স্থায়ীভাবে এই খাত থেকে ছিটকে পড়তে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় একটি শূন্যতা তৈরি করবে।
প্রতিবেদকের অভিমত :– আইপিও কেবল একটি কোম্পানির বাজারে আসার প্রক্রিয়া নয়, এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক বাস্তুতন্ত্র (Ecosystem)। এটি বন্ধ থাকলে এর সাথে জড়িত প্রতিটি খাত চেইন রিঅ্যাকশনের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই পুঁজিবাজারকে সচল রাখতে এবং এই বিপুল সংখ্যক পেশাজীবীদের বেকারত্ব থেকে বাঁচাতে নিয়মিত আইপিও অনুমোদনের ব্যবস্থা সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
সাধারণ মানুষ ভাবেন আইপিও বন্ধ থাকলে শুধু ব্রোকারদের ক্ষতি হয়, কিন্তু এটি অদৃশ্য ভাবে একটি বিশাল শিক্ষিত ও পেশাদার জনবলকে অলস বা বেকার করে দিচ্ছে তাই এই সংকট কাটানোর জন্য দ্রুত আইপিও অনুমোদন দেওয়া এখন সময়ের দাবি।


