৪০ বছরে ষষ্ঠ রাইট ইস্যু: ইউসিবির মূলধন সংগ্রহের পুনরাবৃত্ত কৌশল চলছেই, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ প্রশ্নের মুখে ২য় পর্ব

স্বপ্ন রোজ, নিজস্ব প্রতিবেদক : হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি, নিরীক্ষকের শর্তযুক্ত মতামত (Qualified Opinion) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ নিয়ন্ত্রক ছাড়ের (regulatory forbearance) প্রেক্ষাপটে আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার পরও শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে নতুন মূলধন সংগ্রহে রাইটস অফার আনছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)।
রাইটস অফার ডকুমেন্ট বিশ্লেষণে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে চাপের চিত্র উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে Tk ৫,৫৯৪.৯৩ কোটি প্রভিশন ঘাটতি, পূর্ণ প্রভিশন স্বীকৃত হলে মূলধন পর্যাপ্ততার হার মাত্র ০.৯৩ শতাংশে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা, ইউসিবি ১৯৮৬ সালে আইপিওর পর ১৯৮৮, ১৯৯৪ (দুই দফা), ১৯৯৭ ও ২০১১ সালে মোট পাঁচ দফা রাইটস শেয়ার ইস্যু করেছে ইউসিবি।
বর্তমান প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এটি হবে ব্যাংকটির ৬ বার রাইটস ইস্যু।তবে সর্বশেষ রাইটস অফার ডকুমেন্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, আগের পাঁচ দফা মূলধন সংগ্রহের পরও ব্যাংকটি এখনো হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন সক্ষমতার দুর্বলতা, টানা দুই বছর লভ্যাংশ না দেওয়া, ‘Z’ ক্যাটাগরিতে অবস্থান এবং সম্পদের মানের অবনতিসহ একাধিক আর্থিক চাপে রয়েছে।
ফলে নতুন করে রাইটস শেয়ারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা এবং আগের মূলধন সংগ্রহের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়
১. আর্থিক সংকট — সংখ্যাসহ প্রভিশন ঘাটতি Tk ৫,৫৯৪.৯৩ কোটি টাকা — প্রয়োজনীয় প্রভিশন Tk ৭,৬৭৯.৪২ কোটি, সংরক্ষিত মাত্র Tk ২,৫২৪.৩৯ কোটি। (সূত্র: Rights Offer Document ২০২৬, পৃ. ৩৯-৪০; নিরীক্ষক Aziz Halim Khair Choudhury)
নিরীক্ষক “Qualified Opinion” দিয়েছেন ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণীতে। (সূত্র: ROD পৃ. ৩৯-৪০)
বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি (নং BSD-5(Wing-3)/104/2026-470, তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০২৬) প্রভিশন ঘাটতি সমন্বয় ছাড়াই হিসাব চূড়ান্তকরণের অনুমতি দিয়েছে (regulatory forbearance)। (সূত্র: ROD)
নিরীক্ষক অডিট রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন ৩০ এপ্রিল ২০২৬ — বাংলাদেশ ব্যাংকের forbearance চিঠির ঠিক পরদিন। (সূত্র: ROD পৃ. ৪৫) পূর্ণ প্রভিশন স্বীকৃত হলে CRAR নেমে যেত ০.৯৩%-এ (নিয়ন্ত্রক প্রয়োজনীয়তা ১২.৫০%)। বাস্তবে রিপোর্ট করা হয়েছে ৮.৪২%। (সূত্র: ROD পৃ. ৩৯)
মূলধন ঘাটতি Tk ২,৬৫৯.৬৪ কোটি; প্রভিশন ঘাটতি পূর্ণ স্বীকৃত হলে তা বেড়ে Tk ৫,৯৭৫.৫২ কোটি হতো। (সূত্র: ROD) নিট মুনাফা ধস: ২০২৩ সালে ~Tk ৪৪৭ কোটি থেকে ২০২৪ সালে ~Tk ৮০ কোটি — প্রায় ৮২% পতন।
২০২৫ সালে সামান্য পুনরুদ্ধার হয়ে ~Tk ২৩৮ কোটি, ঐতিহাসিক গড়ে ফেরেনি। (সূত্র: ROD পৃ. ৩৪)
সলো মুনাফা কনসোলিডেটেডের প্রায় তিন গুণ — সলো ২০২৫ নিট মুনাফা Tk ৬৩.৫৮ কোটি (EPS Tk ০.৪১), কনসোলিডেটেড মাত্র Tk ২৩.৮৩ কোটি (EPS Tk ০.১৫) — পার্থক্যের কারণ UCB Fintech-এ Tk ৪৩৮.০২ কোটি ক্ষতির impairment সলো হিসাবে অস্বীকৃত। (সূত্র: ROD পৃ. ৪৮, ৫৩-৫৪)
টানা দুই বছর (২০২৪, ২০২৫) কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা হয়নি; শেয়ার DSE-তে “Z” ক্যাটাগরিতে। (সূত্র: DSE, ROD) Emerging Credit Rating Limited (ECRL)
২৫ জুন ২০২৫-এ UCB-র আউটলুক “Stable” থেকে “Negative”-এ নামিয়েছে (রেটিং গ্রেড AA অপরিবর্তিত)। (সূত্র: ROD পৃ. ৮৩)
UCB 5th Subordinated Bond সম্পূর্ণ সাবস্ক্রাইব হয়নি, সাবস্ক্রিপশন ২৩ জুন ২০২৫-এ বন্ধ হয়ে গেছে।
UCB 2nd Perpetual Bond-ও আংশিক (মাত্র Tk ৩০ কোটি) সাবস্ক্রাইব হয়ে ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ বন্ধ। (সূত্র: ROD নোট ২.১০.১৮, পৃ. ৭৬)
২০২৬-এর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে EPS মাত্র Tk ০.০৭; নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ (NOCFPS) ঋণাত্মক Tk ৪.২২ — আগের বছরের ধনাত্মক Tk ৬.৯৮ থেকে বড় অবনতি। (সূত্র: DSE)
CRAR-এর পতনের প্রবণতা: ২০২৪ সালে ১০.৫৯% থেকে ২০২৫ সালে ৮.৪২%-এ নেমেছে। NPL অনুপাত একই সময়ে ১৪.৯০% থেকে ১৫.৫০%-এ বেড়েছে।
ব্যাংকের পাল্টা যুক্তি: শেয়ার প্রতি বুক ভ্যালু Tk ২৭ (বাজারমূল্য Tk ৯-এর তুলনায় অনেক বেশি), তাই কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন। শেয়ারটি আজ ৯:৮০ (সূত্র: The Daily Star, উদ্ধৃতি UCB CFO ফারুক আহাম্মদ)
২. রাইট শেয়ার ইস্যুর বিস্তারিত
BSEC ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে UCB-র Tk ৭৭৫.১৯ কোটি টাকার রাইট শেয়ার (১:২ অনুপাতে, Tk ১০ অভিহিত মূল্যে) অনুমোদন করে। (সূত্র: BSEC, ROD কভার পৃষ্ঠা)
অনুমোদনের আগের দিন বাজারে শেয়ারের দাম ছিল Tk ৯, অর্থাৎ অভিহিত মূল্যের চেয়ে কম। (সূত্র: The Daily Star, DSE) NAV/শেয়ার Tk ২৫.৭১; ইস্যু মূল্য Tk ১০ — NAV-এর তুলনায় প্রায় ৬১% ছাড়ে নির্ধারিত। (সূত্র: ROD পৃ. ৩৪-৩৫)
ইস্যু সম্পূর্ণভাবে আন্ডাররাইট করা হয়েছে ঢাকা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের মার্চেন্ট ব্যাংকিং শাখা দ্বারা। (সূত্র: BSEC, ROD)
স্পনসর/ডিরেক্টর শেয়ারহোল্ডিং মাত্র ১০.২৭% (৩০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত) — BSEC-র ২০১১ সালের নির্দেশনায় ন্যূনতম প্রয়োজন ৩০%। শুধু বোর্ডের ৫ পরিচালক মিলিয়ে ধারণ মাত্র ৪.০২%। (সূত্র: ROD পৃ. ১৪৫)
DSE-র তথ্য অনুযায়ী স্পন্সর/ডিরেক্টর হোল্ডিং মাত্র ১০.২৭% (জুন ২০২৬ পর্যন্ত অপরিবর্তিত) — এটা সত্যিই কম। প্রথাগতভাবে ব্যাংক/কোম্পানির পরিচালকদের নিজস্ব “স্কিন ইন দ্য গেম” বেশি থাকাটাই প্রত্যাশিত (BSEC নিয়মে নতুন লিস্টিংয়ে ন্যূনতম ৩০% সাধারণত চাওয়া হয়, যদিও পুরনো লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে এই নিয়ম ভিন্নভাবে প্রযোজ্য হতে পারে)।
জনসাধারণের হাতে ৫১.৬০% এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ৩৬.৮১% — অর্থাৎ পরিচালকদের চেয়ে বাইরের বিনিয়োগকারীরাই কার্যত বেশি ঝুঁকি বহন করছেন, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতে নেই।
risingbd.com ২০ অক্টোবর ২০২৫-এ প্রতিবেদন করে যে BSEC “গুরুতর অসঙ্গতি ও নিয়মভঙ্গ” পেয়ে ব্যাখ্যা তলব করেছিল — একই ১০.২৭% পরিসংখ্যান তখনও ছিল, সাত মাস পরও অপরিবর্তিত থেকেই অনুমোদন হয়।
এটি ১৯৮৬ সাল থেকে UCB-র ৬ষ্ঠ রাইট ইস্যু।
ব্যাংকের নিজস্ব স্বাক্ষরিত ঘোষণাপত্র (ROD পৃ. ২১৯) অনুযায়ী পূর্বে হয়েছে: IPO ১৯৮৬, Rights Issue ১৯৮৮, Rights Issue ১৯৯৪ (দুইবার), Rights Issue ১৯৯৭, Rights Issue ২০১১। (সূত্র: ROD পৃ. ২১৯, MD/CEO মোহাম্মদ মামদুদুর রশিদ, DMD/CFO ফারুক আহাম্মদ ও কোম্পানি সচিব তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী স্বাক্ষরিত, ১৩ মে ২০২৬) একই টেবিলে একটি গাণিতিক অমিল দৃশ্যমান: ১৯৯৪ সালের প্রথম রাইট ইস্যুতে ৩৭,১০৯ শেয়ার × Tk ১০০ = Tk ৩৭,১০,৯০০ হওয়ার কথা, কিন্তু নথিতে লেখা Tk ৩৭,১০,৯৯৬ — Tk ৯৬ অমিল।
তহবিলের ব্যবহার সাধারণ/অনির্দিষ্ট — Corporate Loan-এ Tk ৩৭৩.১৮ কোটি, SME-তে Tk ২৫.২৬ কোটি, Retail-এ Tk ১৪.৯৫ কোটি, ভাষা “regular business operations purposes” — নির্দিষ্ট প্রকল্প উল্লেখ নেই। (সূত্র: ROD পৃ. ১৪৪)
৬. অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা (ROD-এর নিজস্ব পাতায়)
Going Concern নোট (২.১.২)-এ ব্যবস্থাপনা তারল্য, মুনাফা, প্রভিশন ও মূলধন পর্যাপ্ততায় “healthy trend” দাবি করেছে — যা একই নথিতে নিরীক্ষকের Qualified Opinion-এর সরাসরি বিপরীত। (সূত্র: ROD পৃ. ৬৬)
ঝুঁকি-অংশে (পৃ. ২৩) UCB 5th Subordinated Bond-কে এখনো “চলমান/আশাবাদী” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, অথচ নোট ২.১০.১৮ (পৃ. ৭৬) অনুযায়ী এর সাবস্ক্রিপশন ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে এবং অসম্পূর্ণ ছিল।
৩. স্বার্থের সংঘাত — ইস্যু ব্যবস্থাপনা
রাইট শেয়ার ইস্যুর যৌথ ইস্যু ম্যানেজার UCB Investment Limited — যা UCB PLC নিজে ৯৯.৯৯% মালিকানাধীন একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান (১০ কোটি শেয়ারের মধ্যে ৯,৯৯,৯৯,৯৯৯টি)। (সূত্র: ROD পৃ. ১, ১৪, ৬০-৬১, সাবসিডিয়ারি শেয়ারহোল্ডিং টেবিল)
BSEC-র নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের সরাসরি স্বার্থের-সংঘাত প্রশ্নের জবাবে সরাসরি উত্তর না দিয়ে শুধু বলেন: “এটা একটা রাইট ইস্যু, এটা এমন না বিশাল প্রিমিয়াম… আইনি কোনো বাধা না থাকায় কমিশন অনুমোদন দিয়েছে… আন্ডার-সাবস্ক্রিপশন হলে আন্ডাররাইটাররা শেয়ার গ্রহণের গ্যারান্টি দিয়েছে, তাই কমিশন অনুমোদন দিয়েছে
প্রতিবেদক:-
আন্ডার রাইডাররা গ্যারান্টি দিয়েছে তাই রাইট অনুমোদন হয়েছে। এই কথাটা কোম্পানির ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য?
আন্ডাররাইটার গ্যারান্টি দিয়েছে” কথাটা শুনতে নিরাপদ মনে হলেও এর প্রকৃত অর্থ ভিন্ন।
আন্ডাররাইটাররা এই ঝুঁকি নেওয়ার বিনিময়ে একটা কমিশন/ফি পায় — এটাই তাদের ব্যবসায়িক মডেল। অর্থাৎ তাদের প্রণোদনা হলো ফি আয় করা, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের দায়িত্বের অংশ নয়।
মুখপাত্র মো. আবুল কালামের বক্তব্যের অর্থ ছিল এই রকম — ব্যাংকের টাকা দরকার, আর আন্ডাররাইটার অভিহিত মূল্যে টাকা দিতে প্রস্তুত, তাই নিয়ন্ত্রক প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
এই যুক্তিতে তিনটা প্রশ্ন উপেক্ষিত থেকে যায়, যেগুলো একজন নিয়ন্ত্রকের বিবেচনায় থাকা উচিত ছিল বিনিয়োগকারী-সুরক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে:
১. আন্ডাররাইটাররা নিজেরাই কতটা আর্থিকভাবে সক্ষম এই গ্যারান্টি পালন করতে? বাংলাদেশের অনেক মার্চেন্ট ব্যাংকের ব্যালান্স শিট ও তারল্য অবস্থা দুর্বল — অর্থাৎ গ্যারান্টিটা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ।
২. আন্ডাররাইটার শেয়ার কিনে নিলে তার পরে কী হয় — এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যা প্রায়ই আলোচনায় আসে না। যদি সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সাবস্ক্রাইব না করেন এবং আন্ডাররাইটাররা বড় অংশ কিনে নেন, তাহলে সেই শেয়ারগুলো তাদের কাছে “আটকে” থাকে — এবং ভবিষ্যতে তারা যখন এগুলো বাজারে বিক্রি করতে চাইবে, সেটা শেয়ারের দামের ওপর অতিরিক্ত বিক্রয়-চাপ (overhang) তৈরি করবে, যা বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও ক্ষতিকর হতে পারে।
গ্যারান্টি মানেই মূল্য ন্যায্য, এটা প্রমাণ করে না। আন্ডাররাইটার টাকা দিতে রাজি থাকা মানে শুধু এটাই বোঝায় যে তারা ফি-এর বিনিময়ে ঝুঁকি নিতে ইচ্ছুক — এটা কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে ১০ টাকা মূল্যে বাজারমূল্য ৯ টাকার বিপরীতে শেয়ার কেনা বিনিয়োগকারীর জন্য লাভজনক সিদ্ধান্ত।(রাইট অনুমোদনের সময় শেয়ার মূল্য ছিল ৯)
ডাইলিউশন — মূল ক্ষতির জায়গা
১:২ অনুপাতে রাইট ইস্যু মানে যে বিনিয়োগকারী সাবস্ক্রাইব করবেন না, তাঁর মালিকানার অংশ (ownership percentage) স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে — কারণ মোট শেয়ার সংখ্যা ৫০% বেড়ে যাচ্ছে।
যিনি সাবস্ক্রাইব করবেন, তাঁকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে নতুন শেয়ার কিনতে হচ্ছে শুধু নিজের অংশ ধরে রাখার জন্য — কার্যত এটা একটা বাধ্যতামূলক অতিরিক্ত বিনিয়োগ, লাভের নিশ্চয়তা ছাড়াই।
সংক্ষেপে — গ্যারান্টিটা কার উপকারে আসে
এই আন্ডাররাইটিং গ্যারান্টি প্রধানত ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রকের (মূলধন সংকট সমাধান) উপকারে আসে, বিনিয়োগকারীদের সরাসরি উপকারে নয়। এটা নিশ্চিত করে ব্যাংক টাকা পাবে, কিন্তু এটা নিশ্চিত করে না যে বিনিয়োগকারীর টাকার মূল্য বাড়বে, ডিভিডেন্ড আসবে, বা শেয়ারের দাম স্থিতিশীল থাকবে।
এ বিষয়ে কোম্পানির সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি কেউ।
৪. পর্ষদ ইতিহাস ও মালিকানার তিন প্রজন্মের বিরোধ
৮ এপ্রিল ১৯৯৩: UCB-র প্রথম চেয়ারম্যান হুমায়ূন জহির পরিচালকদের সাথে বিরোধের জেরে নিহত হন; পরিচালক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এই হত্যার সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত হন। (সূত্র: Wikipedia, সংবাদ সূত্র)
২৬ আগস্ট ১৯৯৯: আখতারুজ্জামান চৌধুরী জোরপূর্বক UCB-র পরিচালনা পর্ষদ দখল করেন। (সূত্র: একই)
পটভূমি (১৯৯১): বাংলাদেশ ব্যাংক আখতারুজ্জামানকে UCB বোর্ড থেকে অপসারণ করে নিজের কোম্পানির অনুকূলে নেওয়া Tk ২৫০ কোটি ঋণ শোধে ব্যর্থতার জন্য; হুমায়ূন জহির প্রতিবাদ করলে তাঁকে “টার্গেট” করা হয়। শরীফ জহিরের অভিযোগ অনুযায়ী, দখলে আখতারুজ্জামানের সাথে যুক্ত ছিলেন তাঁর ভাগ্নে মোহাম্মদ সাইফুল আলম — S Alam গ্রুপের মালিক, যিনি নিজেও পরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত হন। (সূত্র: The Daily Star, ২৯ আগস্ট ২০২৪, শরীফ জহিরের সরাসরি উদ্ধৃতি) ২০১১ সালে UCB-র চেয়ারম্যান ছিলেন স্বয়ং আখতারুজ্জামান চৌধুরী, এমপি; বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জহির (নিহত হুমায়ূন জহিরের পুত্র) তখন তাঁরই বোর্ডে পরিচালক ও Audit Committee-র সহ-সদস্য ছিলেন। (সূত্র: UCB বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১১)
শরীফ জহির UCB বোর্ডে ছিলেন বিচ্ছিন্ন মেয়াদে — ২০০৩-২০০৬, ২০১০-২০১৮ (২০১৩-১৫ ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে), কিন্তু ২০১৯-২০২৩ সময়কালে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিলেন — বোর্ডে ছিলেন না। (সূত্র: UCB বার্ষিক প্রতিবেদন ২০০৩-২০২৪, সরাসরি যাচাইকৃত) ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে (শরীফ জহির বোর্ডে না থাকা অবস্থায়) ফরেনসিক অডিটে আনুমানিক ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে। (সূত্র: একাধিক সংবাদমাধ্যম, ফরেনসিক অডিট)
২৯ আগস্ট ২০২৪: বাংলাদেশ ব্যাংক UCB-র বোর্ড পুনর্গঠন করে; শরীফ জহির সর্বসম্মতিক্রমে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। (সূত্র: The Business Standard) শরীফ জহির ছাড়া বর্তমান বোর্ডের প্রতিটি সদস্যই সম্পূর্ণ নতুন — জাভেদ-জামান আমলের বোর্ডের সাথে কোনো পূর্ব সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। (সূত্র: UCB বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪)
কেন এই সময়টা রাইট ইস্যুর জন্য উপযুক্ত মনে হচ্ছে না:
প্রভিশন ঘাটতি (Tk ৫,৫৯৫ কোটি) এখনো অমীমাংসিত অবস্থায় নতুন মূলধন তোলা হচ্ছে।বাজারমূল্য Tk ৯ (ছিল)অভিহিত মূল্যের (Tk ১০) নিচে থাকা অবস্থায় জোরপূর্বক প্রিমিয়ামে ইস্যু, যা প্রচলিত চর্চার বিপরীত।টানা দুই বছর লভ্যাংশহীন ও Z-ক্যাটাগরিতে থাকা অবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগকারীদের কাছে টাকা চাওয়া
ইস্যু ব্যবস্থাপনায় স্বার্থের সংঘাত (ব্যাংকের নিজস্ব সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইস্যু ম্যানেজার) অমীমাংসিত।আন্তর্জাতিক সম্পদ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি, যা মূলধন ঘাটতির একটা অংশ পূরণ করতে পারত।
এটি ৪০ বছরে ব্যাংকের ৬ষ্ঠ রাইট ইস্যু — বারবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে মূলধন চাওয়ার এই পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন প্রশ্ন তোলে যে ব্যাংকটি নিজস্ব মুনাফা থেকে টেকসইভাবে মূলধন গড়ে তুলতে পারছে কিনা
পুঁজিবাজারে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব-
১. নজির তৈরির ঝুঁকি — যদি একটা ব্যাংক যার শেয়ার অভিহিত মূল্যের নিচে, প্রভিশন ঘাটতি আছে, এবং Z ক্যাটাগরিতে আছে, তার রাইট ইস্যু শুধু “আন্ডাররাইটার গ্যারান্টি দিয়েছে” ও “আইনি বাধা নেই” — এই দুই কারণে অনুমোদিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের আরও দুর্বল ব্যাংক একই পথে একই যুক্তিতে মূলধন সংগ্রহের উৎসাহ পেতে পারে। এতে বাজারে একই ধরনের একাধিক জোরপূর্বক ইস্যুর ঢল নামার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
২. খুচরা বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও ক্ষয় — DSE-তে ইতিমধ্যে খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ও আস্থা নিয়ে সমস্যা আছে (যা সামাজিক মাধ্যমের প্রতিক্রিয়াতেও দেখা গেছে)। যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন ইস্যু অনুমোদন করে যা বাজার-বিশেষজ্ঞদের মতেই বিনিয়োগকারী-স্বার্থবিরোধী, তাহলে এটা সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারে খুচরা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমিয়ে দিতে পারে — শুধু UCB নয়, সামগ্রিক বাজারের ক্ষেত্রেও।
৩. মার্চেন্ট ব্যাংক/আন্ডাররাইটারদের ওপর কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি — একাধিক দুর্বল ব্যাংক একযোগে রাইট ইস্যু করলে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সাবস্ক্রাইব না করলে, সীমিতসংখ্যক মার্চেন্ট ব্যাংক (যাদের নিজেদের ব্যালান্স শিটও দুর্বল বলে ইতিমধ্যে চিহ্নিত) বড় পরিমাণ শেয়ার ধরে রাখতে বাধ্য হবে — এটা তাদের নিজস্ব আর্থিক অবস্থাকেও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, একটা সিস্টেমিক সংক্রমণ (contagion) ঝুঁকি তৈরি করে।
৪. ব্যাংক খাত-সূচকে চাপ — একাধিক ব্যাংক একই সময়ে মূলধন সংকট ও রাইট ইস্যুর মধ্য দিয়ে যাওয়ায় (২০২৪-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে উন্মোচিত legacy NPL সমস্যার কারণে), DSE-র ব্যাংকিং খাত সূচকে সামগ্রিক নেতিবাচক sentiment তৈরি হতে পারে।
৫. ইস্যু ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতার মান দুর্বল হওয়া — ব্যাংকের নিজস্ব সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে ব্যবহারের এই ঘটনা অচ্যালেঞ্জড থেকে গেলে, ভবিষ্যতে অন্যান্য কোম্পানিও একই পথে হাঁটতে পারে — যা সামগ্রিক বাজারে ইস্যু ব্যবস্থাপনার নিরপেক্ষতার মান কমিয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ — চল্লিশ বছরে ছয়বার — এই একটি সংখ্যাই বলে দেয় ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের গল্পটা আসলে কী। ১৯৮৬ সালে তালিকাভুক্তির পর থেকে পাঁচবার শেয়ারহোল্ডারদের কাছে হাত পেতেছে ব্যাংকটি; ২০২৬ সালে যখন ষষ্ঠবারের জন্য একই আবেদন যাচ্ছে, তখন প্রশ্নটা আর নতুন নয় — শুধু এবার তার ওজন অনেক বেশি।
কারণ এবার শুধু মূলধন ঘাটতির গল্প নয়। নিরীক্ষক নিজেই “কোয়ালিফাইড অপিনিয়ন” দিয়ে বলে দিয়েছেন সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি লুকিয়ে আছে হিসাবের খাতায়, আর সেই লুকোনোটা সম্ভব হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক বিশেষ অনুমতিতে — যে চিঠি আসার ঠিক একদিন পরই নিরীক্ষক তাঁর স্বাক্ষর বসিয়েছেন।
পূর্ণ হিসাব কষলে যে ব্যাংকের মূলধন-পর্যাপ্ততা অনুপাত নেমে যেত শূন্য দশমিক নয় তিন শতাংশে — নিয়ন্ত্রক-নির্ধারিত সাড়ে বারো শতাংশের ধারেকাছেও নয় — সেই ব্যাংকই এখন সাধারণ মানুষের কাছে নতুন করে টাকা চাইছে।
আর এই পুরো প্রক্রিয়াটার তদারকিতে যাঁদের থাকার কথা ছিল নিরপেক্ষ, স্বাধীন চোখে — সেই ইস্যু ব্যবস্থাপকদের একজন খোদ ব্যাংকেরই শতভাগের কাছাকাছি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে উত্তর এসেছে শুধু একটাই যুক্তিতে — আন্ডাররাইটার টাকা দিতে রাজি, তাই অনুমোদন। স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নটা থেকে গেছে অনুত্তরিত।
এর সাথে যোগ করুন তিন দশকের একটা পারিবারিক ছায়া, যা এই ব্যাংকের প্রতিটি সংকটের পেছনে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৯৩ সালের ৮ এপ্রিল, ঢাকার ধানমন্ডিতে নিজের বাসায় গুলিতে নিহত হন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুমায়ূন জহির — পরিচালকদের সাথে বিরোধের জেরে।
সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত হন সহ-পরিচালক আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু, যিনি জামিনে মুক্তি পেয়ে দেশ ছাড়েন, এবং ছয় বছর পর, ১৯৯৯ সালের ২৬ আগস্ট, অস্ত্রের মুখে জোরপূর্বক ব্যাংকের পুরো পর্ষদ দখল করে নেন।
এরপর প্রায় দুই দশক ধরে নিহত চেয়ারম্যানের পরিবার (পুত্র শরীফ জহির) এবং সন্দেহভাজন হত্যাকারীর পরিবার — দুই পক্ষই একই বোর্ডরুমে পাশাপাশি বসেছে, এমনকি একই কমিটিতে কাজ করেছে। ২০১১ সালে তো আখতারুজ্জামান নিজেই ছিলেন চেয়ারম্যান, আর শরীফ জহির তাঁরই বোর্ডে পরিচালক।
আখতারুজ্জামানের ছেলে সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ পরে ভূমি প্রতিমন্ত্রী হন, এবং মন্ত্রিত্বকালে স্ত্রী রুখমিলা জামানকে চেয়ারপারসন বানিয়ে পর্দার আড়াল থেকে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ। ঠিক সেই সময়টাতেই (২০১৯-২০২৩) শরীফ জহির বোর্ডে ছিলেন না — এবং সেই একই সময়ে ফরেনসিক অডিটে ধরা পড়ে ৩৫০ মিলিয়ন ডলারের লুণ্ঠন।
২০২৪ সালে সরকার পতনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো বোর্ড ভেঙে দেয়, জাভেদ পরিবার দেশ ছাড়ে (যুক্তরাজ্য-দুবাই-সিঙ্গাপুরে তাদের সম্পদ এখন জব্দ), আর শরীফ জহির ফিরে আসেন চেয়ারম্যান হয়ে — অনেকটা যেন এক প্রজন্ম পরে বাবার হারানো আসনে পুত্রের প্রত্যাবর্তন।
এই ইতিহাস মাথায় রাখলে একটা প্রশ্ন এড়ানো কঠিন — ক্ষমতার এই রদবদল কি এখানেই থামবে? গত তিন দশকে UCB-র নিয়ন্ত্রণ অন্তত তিনবার হাত বদল হয়েছে — জোরপূর্বক দখল, রাজনৈতিক প্রভাবে দখল, আর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে পুনরুদ্ধার।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে মালিকানা পরিবর্তনের এই প্যাটার্ন নতুন নয়। এটা কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয় — কেউ বলতে পারে না ভবিষ্যতে এই ব্যাংক আবার অন্য কারো হাতে যাবে কিনা। কিন্তু ঐতিহাসিক প্যাটার্নটা মাথায় রাখলে, বর্তমান নিয়ন্ত্রণও যে চিরস্থায়ী তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সবচেয়ে বড় কথা হলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের প্রশ্নটা অমীমাংসিত থেকেই গেল।














