মক্কার সামরিক জোটে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র নীতি কি ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছে?

আপডেট: August 28, 2026 |
sdsdsdsd
print news

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের মূল দর্শন। সেই নীতির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ অবস্থান সামনে রেখে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের যৌথ প্রতিরক্ষা জোট মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্টে (এমজেডিএ) যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা এতে কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে।

কারণ মক্কা জোট কেবল অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো নয়, এর কেন্দ্রে রয়েছে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার। জোটের কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরাও সেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বাস্তবতা তৈরি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন কোনো আঞ্চলিক সংঘাতও একসময় ঢাকার জন্য নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির সংকটে পরিণত হতে পারে।

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর অর্থনৈতিক ও মানবিক সম্পর্ক, তুরস্কের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সম্ভাবনা মক্কা জোটকে ঢাকার কাছে কৌশলগতভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে এর বিপরীতে ভারতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ, সম্ভাব্য পাল্টা সামরিক জোট এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর চাপ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

সৌদি আরবের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই উদ্যোগে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর। তবে বাংলাদেশ এখনো চুক্তিটির সদস্য হয়নি।

গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিন দেশের কোনো একটি দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এই জায়গাটিই বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিরাপত্তা স্বার্থ এক নয়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতাও তাদের মতো নয়। ফলে কোনো সদস্য দেশের সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশের সংঘাত তৈরি হলে বাংলাদেশ সেই সংঘাতের বাইরে থাকতে পারবে কি না, সেটি স্পষ্ট না করে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দেওয়া ঢাকার দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক ভারসাম্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ থেকে ‘বাংলাদেশ প্রথম’

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুল উচ্চারিত দর্শন ছিল, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’। এই নীতির মধ্য দিয়ে ঢাকা বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি কোনো পক্ষ না নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিজস্ব প্রয়োজন ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ পেয়েছে।

ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ধরন এক নয়। কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রেই মূল বিবেচনা ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ।

বর্তমান সরকার সেই দর্শনের সঙ্গে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিকে সামনে এনেছে। অর্থাৎ বন্ধুত্ব থাকবে, সহযোগিতা থাকবে, প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশলগত অংশীদারত্বও থাকবে, কিন্তু কোনো দেশের স্বার্থ বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের ওপরে স্থান পাবে না।

এই জায়গা থেকেই মক্কা জোটের প্রশ্নটি দেখা দরকার।

কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো কিংবা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এক বিষয়। আর এই তিন দেশের সঙ্গে এমন একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হওয়া, যেখানে একজন আক্রান্ত হলে অন্যরাও আক্রান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

অন্যের শত্রু কি বাংলাদেশের শত্রু হবে?

মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখানেই।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা উদ্বেগের সঙ্গে ইরান, ইয়েমেন, পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সরাসরি যুক্ত। তুরস্কের নিরাপত্তা স্বার্থের সঙ্গে সিরিয়া, ইরাক, কুর্দি ইস্যু ও আঞ্চলিক প্রভাব জড়িত। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সমীকরণে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সঙ্গে এসব সংঘাতের সরাসরি সম্পর্ক নেই।

ধরা যাক, ভবিষ্যতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘাত হলো। মক্কা চুক্তির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ তখন কোন অবস্থান নেবে? পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য কি ঢাকার ওপর চাপ তৈরি হবে? নাকি বাংলাদেশ বলবে, এটি দুই দেশের নিজস্ব সংঘাত এবং ঢাকা এতে জড়াবে না?

একই প্রশ্ন উঠতে পারে সৌদি আরব ও ইরানের সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও।

বাংলাদেশের কোনো জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নেই এমন একটি যুদ্ধে যদি জোটের কারণে ঢাকাকে অবস্থান নিতে হয়, তাহলে সেটি ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন।

জোটটি কি সত্যিই ‘ইসলামিক ন্যাটো’?

মক্কা চুক্তিকে ইতোমধ্যে অনেকে ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান অবস্থায় এটিকে ন্যাটোর সমতুল্য সামরিক জোট বলা অতিরঞ্জিত হবে।

কারণ এখনো এর স্থায়ী যৌথ সামরিক কমান্ড, সমন্বিত গোয়েন্দা কাঠামো কিংবা ন্যাটোর মতো পরীক্ষিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। ফলে চুক্তিটি বর্তমানে কতটা কার্যকর সামরিক জোটে পরিণত হবে, সেটিও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

এই অনিশ্চয়তাই বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বিবেচনার বিষয়।

একটি জোটের কাঠামো যখন পুরোপুরি পরিষ্কার নয়, তখন তার ভবিষ্যৎ সামরিক দায়বদ্ধতা নির্ধারণ না করে সদস্য হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে।

স্বাধীন গবেষক আলতাফ পারভেজও মনে করেন, মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ বিস্তার ও চরিত্র এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তাঁর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি সামরিক জোটের বিস্তার হলে দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোর ওপর কৌশলগত চাপ বাড়তে পারে এবং প্রক্সি সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সুযোগও আছে, কিন্তু শর্ত কী?

মক্কা জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তিও রয়েছে।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত বিকশিত হয়েছে। সামরিক প্রযুক্তি, ড্রোন, প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে আঙ্কারার সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগও রয়েছে।

ফলে মক্কা চুক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলে বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং কৌশলগত যোগাযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করার সুযোগও তৈরি হবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব সুবিধা পাওয়ার জন্য কি পারস্পরিক যুদ্ধের দায় নেওয়া প্রয়োজন?

বাংলাদেশ চাইলে তিন দেশের সঙ্গেই দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী যৌথ মহড়া, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় কিংবা প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারে।

সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিটি সম্পর্কের সীমা নির্ধারণ করতে পারবে। কিন্তু যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে গেলে সেই স্বাধীনতার একটি অংশ পারস্পরিক অঙ্গীকারের মধ্যে চলে যেতে পারে।

পাল্টা সামরিক সমীকরণ কি তৈরি হচ্ছে?

মক্কা চুক্তির প্রভাব শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আলতাফ পারভেজের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে মক্কা চুক্তিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। তাঁর মতে, এ ধরনের জোটের প্রতিক্রিয়ায় পাল্টা সামরিক সমীকরণ তৈরি হলে ভারত ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতাও নতুন মাত্রা পেতে পারে।

মক্কা চুক্তির পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করার ঘটনাটিকেও ওই বিশ্লেষণে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ একটি নতুন সামরিক কাঠামো গড়ে উঠলে তার প্রতিক্রিয়ায় অন্য পক্ষগুলোও নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব শক্তিশালী করতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি মক্কা জোটের সদস্য হয়, তাহলে দেশটি শুধু একটি নতুন সহযোগিতা কাঠামোর অংশ হবে না, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক সামরিক প্রতিযোগিতার একটি অংশ হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকবে।

এটাই ছোট রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা।

ভারতের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র বিবেচনা নয়

মক্কা জোটের অন্যতম সদস্য পাকিস্তান হওয়ায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, জাপান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কেও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে।

তবে শুধু ভারত কী ভাববে, সেটিকে বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের প্রধান মানদণ্ড বানানোও ঠিক হবে না।

‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির অর্থ যদি সত্যিই জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকা উচিত।

অর্থাৎ ভারত আপত্তি করবে বলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না, এমনটি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার জন্য এমন কোনো সামরিক জোটে যাওয়া, যা ভারতের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত তৈরি করতে পারে, সেটিও জাতীয় স্বার্থের বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

মূল বিষয় হওয়া উচিত, কোনো সম্পর্ক যেন অন্য সম্পর্ককে অকারণে শত্রুতায় পরিণত না করে।

মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্কের হিসাব

বাংলাদেশের মধ্যপ্রাচ্যনীতি শুধু সৌদি আরবকে ঘিরে নয়।

সৌদি আরবের পাশাপাশি কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমানসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও জ্বালানি সম্পর্ক রয়েছে।

মক্কা জোট ভবিষ্যতে কোন দিকে যায়, সেটি এসব সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে জোটটি যদি ইরানকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয়ে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আবার জোটটি যদি পরবর্তীতে আরও বিস্তৃত হয়ে ইরান, ইরাক বা অন্য দেশকে যুক্ত করে, তাহলে এর বর্তমান চরিত্রও বদলে যেতে পারে।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশকে কোনো একটি পক্ষের নিরাপত্তা কাঠামোর স্থায়ী অংশ হওয়ার আগে অপেক্ষা করে জোটটির বাস্তব রূপ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগও বিবেচনা করতে হতে পারে।

১৯৯০ সালের নজির, কিন্তু পরিস্থিতি আলাদা

সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়।

১৯৯০ সালে ইরাক কুয়েত দখল করার পর সৌদি আরবের অনুরোধে বাংলাদেশ উপসাগরীয় অঞ্চলে সেনা পাঠিয়েছিল। বাংলাদেশি সেনারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী কুয়েতের নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখেন।

সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কিন্তু ১৯৯০ সালের ওই সিদ্ধান্ত এবং মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়া এক বিষয় নয়।

তখন বাংলাদেশ একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক সংকটে অংশ নিয়েছিল। মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা দায় তৈরি হতে পারে।

অতএব অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বর্তমান সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চুক্তির প্রতিটি সামরিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ কি তবে পুরোনো নীতি?

এখানে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ এবং ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

বরং একটি নীতি সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করতে পারে, আর অন্যটি সেই সম্পর্কের সীমা নির্ধারণ করতে পারে।

বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সামরিক সহযোগিতা করবে। অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তুলবে। কিন্তু কোনো বন্ধুত্বের কারণে বাংলাদেশের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হবে না।

এটাই হতে পারে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির বাস্তব অর্থ।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মক্কা জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হওয়া উচিত, জোটের কোনো সদস্যের সংঘাত যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের সংঘাতে পরিণত না হয়।

যদি সেই নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথ প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার মধ্যে দ্বিতীয়টির ঝুঁকি অনেক বেশি।

সিদ্ধান্তে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থ

মক্কা জোটকে ঘিরে বাংলাদেশে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তার পেছনে একাধিক বাস্তব কারণ রয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক, তুরস্কের সামরিক সক্ষমতা, পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের সম্ভাবনা এবং মুসলিম বিশ্বের একটি নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় বাংলাদেশের উপস্থিতি, সবই গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি শুধু বন্ধুত্বের হিসাব নয়। এটি একই সঙ্গে ঝুঁকি, দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির হিসাব।

আলতাফ পারভেজের বিশ্লেষণসহ সাম্প্রতিক আলোচনায় যে বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে, তা হলো, মক্কা চুক্তি ভবিষ্যতে বৃহত্তর সামরিক মেরুকরণের অংশ হয়ে উঠলে ছোট দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়তে পারে।

তাই বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হওয়া উচিত না, ‘মক্কা জোটে গেলে কোন দেশ খুশি হবে বা কোন দেশ অখুশি হবে’। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, কূটনৈতিক স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে।

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতি বাংলাদেশকে বহু বছর ধরে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ দিয়েছে। ‘বাংলাদেশ প্রথম’ সেই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে জাতীয় স্বার্থকে রাখার কথা বলছে।

দুটি নীতির সমন্বয় তখনই সম্ভব, যখন বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থানের অংশ না হয়ে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারে।

মক্কা জোট যদি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ায়, নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করে এবং একই সঙ্গে ঢাকার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখে, তাহলে সেটি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।

কিন্তু যদি জোটের কোনো সদস্যের যুদ্ধ বাংলাদেশের যুদ্ধ হয়ে যায়, যদি অন্য দেশের শত্রু বাংলাদেশের শত্রুতে পরিণত হয়, কিংবা একটি জোটের কারণে ঢাকার অন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক সংকুচিত হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই:

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ আর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির জায়গায় তখন কি কোনো একটি জোটের স্বার্থই অগ্রাধিকার পেয়ে যাবে?

আর সেই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, মক্কা জোট বাংলাদেশের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ, নাকি পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতার সামনে একটি নতুন পরীক্ষা।

লেখক: তৌহিদ রিয়াদ, যুগ্ম সম্পাদক, ইউরো বাংলা নিউজ।
ই-মেইল:riyadhtowhid007@gmail.com

Share Now

এই বিভাগের আরও খবর