১০ বছর পর ভোটের লড়াইয়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপি

 

দীর্ঘ দশ বছর পর আবারও জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটের লড়াইয়ে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি। আগামীকাল রোববার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে একটি আসনের প্রার্থী মারা যাওয়ায় ২৯৯ আসনে ভোট হবে। মৃত্যুজনিত কারণে গাইবান্ধা-৩ আসনে ভোটগ্রহণ পিছিয়ে ২৭ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে।

এবারই প্রথমবারের মতো ছয়টি সংসদীয় আসনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো হলো ঢাকা-৬, ঢাকা-১৩, রংপুর-৩, খুলনা-২, সাতক্ষীরা-২ ও চট্টগ্রাম-৯। ইতোমধ্যে ব্যালট পেপারসহ নির্বাচনী সকল মালামাল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

নিবন্ধিত ৩৯টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর পাশাপাশি অনিবন্ধিত অনেক রাজনৈতিক দল প্রধান দুই জোটের সঙ্গে জোট হয়ে নির্বাচনে লড়ছে। এর বাইরে বামমোর্চা ও ইসলামী কয়েকটি দলের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে চষে বেড়িয়েছেন।

দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপির দাবি, সরকারি দলের চেয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানোর সুযোগ কম পেয়েছে তারা। তবুও সবার প্রত্যাশা ভোটের দিন যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকে ও সবাই ভোট দিতে পারেন। নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের আশায় রাত পার করবেন দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন কমিশনের কাছে আমরা সুবিচার পাইনি। আমাদের প্রার্থীদের প্রচার চালাতে দেয়া হয়নি। এখন ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা। কিন্তু ইসি এর প্রতিকার করছে না।

ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে মাঠে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে অনেকেরই মধ্যে চাপা ভীতি কাজ করছে। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন- নির্বাচন নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই। ভোট উৎসবমুখর হবে।

তিনি বলেন, বিপুল সংখ্যক ও সর্বাধিক প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। উৎসবমুখর ভোট হবে এটাই আশা। আমরা প্রস্তুত, ভোটাররা সবাই উৎসবমুখর এবং আনন্দঘন পরিবেশে ভোটে অংশগ্রহণ করবে।

৩০ ডিসেম্বর ভোটে মূল লড়াই হবে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে। তবে, প্রচার শেষ হলেও নৌকার চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। বিশেষ করে, রাজধানীতে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের কে কোন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তা-ই জানার সুযোগ পাননি রাজধানীবাসী। তবে, নৌকা-ধানের শীষের প্রতীক থাকার কারণে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের পছন্দের প্রতীক ও প্রার্থীকে চিনে নিতে বেগ পেতে হবে না।

ফলাফল জানা যাবে যেভাবে

ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়ার বিষয়ে ইসির অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান বলেন, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই ফলাফল ঘোষণা হবে। প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ শেষে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে কেন্দ্রেই ভোট গণনা করবেন। এ সময় সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, প্রার্থীর এজেন্টরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। ভোট গণনা শেষে প্রিজাইডিং অফিসার লিখিত ফলাফল সংশ্লিষ্টদের সরবরাহ করবেন। পরে এ ফলাফল রিটার্নিং অফিসারের কাছে পাঠাবেন। রিটার্নিং অফিসাররা তা ইসিতে পাঠাবেন। ইসির ফোয়ারা প্রাঙ্গণে স্থাপিত মঞ্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করা হবে। এ চত্বরে ইসি দশটি মনিটরের মাধ্যমে ফলাফল প্রদর্শন করবে।

যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

নির্বাচন উপলক্ষে আজ (শনিবার) মধ্যরাত (রাত ১২টা) থেকে ভোটের দিন (৩০ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ১২টা পর্যন্ত সবধরনের যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই সময়ে বেবি ট্যাক্সি/অটোরিকশা/ইজিবাইক, ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক, টেম্পোসহ স্থানীয় যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইসি। আর গতকাল শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাত (রাত ১২টা) থেকে ১ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাত (রাত ১২টা) পর্যন্ত মোট চারদিন সারাদেশে মোটরসাইকেল চালানোয় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে সাংবাদিকরা ইসির স্টিকার ব্যবহার করে বাইক চালাতে পারবেন।

জানা গেছে, যানচলাচলের নিষেধাজ্ঞা রিটার্নিং কর্মকর্তার অনুমতি সাপেক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্ট, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের (পরিচয়পত্র থাকতে হবে) ক্ষেত্রে শিথিলযোগ্য। তাছাড়া নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিক (পরিচয়পত্র থাকতে হবে), নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, নির্বাচনের বৈধপরিদর্শক ও কতিপয় জরুরি কাজ যেমন- অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডাক, টেলিযোগাযোগ ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত যানবাহন নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। এছাড়া মহাসড়ক, বন্দর ও জরুরি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, এবার ভোটে রিটার্নিং অফিসার হিসেবে ৬৬ জন দায়িত্বপালন করছেন। এর মধ্যে দুইজন বিভাগীয় কমিশনার এবং ৬৪ জন জেলা প্রশাসক।

সচিব আরও জানান, ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্রের দুই লাখ সাত হাজার ৩১২টি ভোটকক্ষে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৭ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার পাঁচ কোটি ২৫ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৫ জন এবং মহিলা ভোটার রয়েছেন পাঁচ কোটি ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩১২ জন। নতুন প্রায় এক কোটি ২৩ লাখ ভোটার প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেবেন।

জানা যায়, এবার ইসির নিবন্ধনে থাকা ৩৯টি রাজনৈতিক দলের সবগুলো দলই অংশগ্রহণ করছে। ২৯৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৮৬১ জন। এরমধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৭৩৩ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ১২৮ জন প্রার্থী।

ভোটকেন্দ্র এবং নির্বাচনী এলাকায় সেনাবাহিনী ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ছয় লাখ আট হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে পুলিশ প্রায় এক লাখ ২১ হাজার, আনসার প্রায় চার লাখ ৪৬ হাজার, গ্রাম পুলিশ প্রায় ৪১ হাজার। সেনাবাহিনী (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) ৩৮৯টি উপজেলায় ৪১৪ প্লাটুন, নৌবাহিনী ১৮টি উপজেলায় ৪৮ প্লাটুন, কোস্টগার্ড (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) ১২টি উপজেলায় ৪২ প্লাটুন, বিজিবি (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) ৯৮৩ প্লাটুন, র্যাব (প্রতি প্লাটুনে ৩০ জন) প্রায় ৬০০ প্লাটুন ভোটের মাঠে নিয়োজিত আছে। এছাড়া মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের সংখ্যা (র্যাবসহ) প্রায় দুই হাজার প্লাটুন (প্রায় ৬৫ হাজার), তাছাড়া সারাদেশে জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশের টহল দল নিয়োজিত আছে।

ভোটের দায়িত্বে ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচনী কর্মকর্তা

এক হাজার ৩২৮ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে আচরণবিধি প্রতিপালনের জন্য ৬৫২ জন, অবশিষ্ট ৬৭৬ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোবাইল/স্ট্রাইকিং ফোর্সের সঙ্গে নিয়োজিত রয়েছেন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৬৪০ জন, ১২২টি ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটিতে ২৪৪ জন, প্রিজাইডিং অফিসার ৪০ হাজার ১৮৩ জন, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার দুই লাখ সাত হাজার ৩১২ জন এবং পোলিং অফিসার চার লাখ ১৪ হাজার ৬২৪ জন।

দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক

দেশি ৮১টি পর্যবেক্ষক সংস্থার ২৫ হাজার ৯০০, ফেম্বোসা, এএইএ, ওআইসি ও কমনওয়েলথ হতে আমন্ত্রিত ও অন্যান্য বিদেশি পর্যবেক্ষক ৩৮ জন, কূটনৈতিক/বিদেশি মিশনের কর্মকর্তা ৬৪ জন এবং বাংলাদেশস্থ দূতাবাস/হাইকমিশন বা বিদেশি সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশি ৬১ জন।

মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ

নির্বাচনে অবৈধ লেনদেন বন্ধে শুক্রবার (২৮ ডিসেম্বর) বিকেল ৫টা থেকে আগামী ৩০ ডিসেম্বর বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবধরনের মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ থাকবে। নির্বাচন কমিশন একটি রাজনৈতিক দলের দাবির প্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।