ভারতের ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন কি বিজেপিকে রাজনীতি পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করবে?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) গত এক যুগে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। নির্বাচনী সাফল্য, সাংগঠনিক বিস্তার এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ- সব মিলিয়ে দলটির আধিপত্য নিয়ে খুব কমই প্রশ্ন উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন সেই আধিপত্যের অন্য একটি দিক সামনে নিয়ে এসেছে- ক্ষমতা থাকলেও জনগণের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব ও বৈধতার জায়গাটি কি ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে?
গত ৪ আগস্ট রাতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় শহর পাটনার একটি ভোট গণনা কেন্দ্রে এমনই একটি বার্তা পাওয়া যায়। জাতীয় রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরের বিহারের বিধানসভা আসন ব্যাংকিপুরে তিন দশকের বিজেপির দখল ভেঙে দিয়েছে তুলনামূলক নবীন দল জন সুরাজ পার্টি। দলটির নেতৃত্বে রয়েছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদ থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রশান্ত কিশোর।
ব্যাংকিপুর আসনটি কয়েক মাস আগেও বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের দখলে ছিল। ফলে এই আসনে দলের পরাজয়কে বিজেপির জন্য প্রতীকী ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
তবে এই নির্বাচনী ফলের তাৎপর্য শুধু একটি আসনে বিজেপির পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। সাত সপ্তাহ ধরে চলা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মুখে তাকে পদ ছাড়তে হয়। নয়াদিল্লি থেকে শুরু হয়ে যে আন্দোলন পরে ভারতের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে, তার অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ইনস্টাগ্রামে জন্ম নেওয়া একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম।
কীভাবে জন্ম নিল ‘ককরোচ’ আন্দোলন?
গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বেকার তরুণ ভারতীয়দের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ হিসেবে তুলনা করেছেন- এমন মন্তব্যের পর ইনস্টাগ্রামে সিজেপির জন্ম হয়। খুব দ্রুতই এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ থেকে শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর আন্দোলনের অন্যতম প্রতীকে পরিণত হয়।
বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে এটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও এতে যুক্ত হন।
বিজেপির জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন অবশ্য আন্দোলনকারীদের সমালোচনা করে তাদের ‘দেশ ভাঙার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত ভাইরাস ও তেলাপোকা বাহিনী’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টি ভেঙে পড়ে, তা হলো ব্যাংকিপুরে বিজেপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ।
এই অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী ফল ভারতের রাজনীতিতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে- তরুণদের এই নতুন ধরনের আন্দোলন কি বিজেপির মতো শক্তিশালী রাজনৈতিক যন্ত্রকেও তার রাজনীতির ধরন নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে?
তরুণদের মন জয়ের বিজেপির চেষ্টা
তরুণদের আন্দোলনকে বিজেপি নিছক সাময়িক বিরক্তি হিসেবে দেখছে না- দলটির সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডেই এর প্রমাণ মিলছে। বিক্ষোভ তুঙ্গে থাকার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইনস্টাগ্রামে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে একাধিক সেলফি-ধাঁচের ভিডিও প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোদি তার মন্ত্রিসভার সহকর্মীদেরও তরুণদের কাছে পৌঁছাতে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পরামর্শ দেন। মন্ত্রীদের সংবাদ সম্মেলনের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রিল তৈরির মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে বলা হয়।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশেও বিজেপি নতুন প্রজন্মের ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্কুলে পাঠিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
দলটি এমন একটি ভিডিওও প্রকাশ করেছে, যেখানে জিমে একদল তরুণের সঙ্গে এক বয়স্ক প্রশিক্ষক আধুনিক ইন্টারনেট-স্ল্যাং নিয়ে কথা বলছেন। পরে কথোপকথন ঘুরিয়ে নেওয়া হয় সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দিকে।
তবে এই ভিডিও নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ঠাট্টা হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, বিজেপি যেন তরুণদের দিয়ে তরুণদের জন্যই প্রচারণামূলক বক্তব্য তৈরি করিয়েছে।
আরেকটি মোদি-ভিডিও ফেসবুক থেকে অল্প সময়ের জন্য উধাও হয়ে যাওয়ার পর ভারতের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সংসদীয় কমিটি মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গের কাছে ব্যাখ্যা ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি তোলে।
সামাজিক মাধ্যমে বদলে যাচ্ছে বিজেপির রাজনৈতিক ভাষা?
নয়াদিল্লিভিত্তিক বিশ্লেষক আসিম আলির মতে, তরুণদের কাছে পৌঁছাতে বিজেপির এই হঠাৎ তৎপরতা দলটির যোগাযোগ কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা প্রকাশ করছে।
তার ভাষায়, একসময় বিজেপি এমন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করতে পারত, যা দলটির সমর্থকেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছড়িয়ে দিতেন। কিন্তু এখন দলটির অনেক প্রচারণাই ‘পরিকল্পিত ও অর্থ দিয়ে পরিচালিত’ বলে মনে হয়।
আসিম আলি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে বিজেপির যোগাযোগব্যবস্থা এখনও শক্তিশালী। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ইনস্টাগ্রামে, ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের সময়ের মতো স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ ও পরিচিতি তৈরি করতে দলটি পারছে না।
তার মতে, ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের যুগে বিজেপির ওপর থেকে নিচে পরিচালিত সাংগঠনিক প্রচারণা বেশ কার্যকর ছিল। কিন্তু ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীদের নিজস্ব অংশগ্রহণ, ব্যঙ্গ ও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্যারিসের সায়েন্সেস পোতে অবস্থিত সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জিল ভার্নিয়েরও মনে করেন, বিজেপির বর্তমান তৎপরতা নীতিগত পরিবর্তনের চেয়ে ভাবমূর্তি রক্ষার লড়াই বেশি।
তার মতে, শিক্ষামন্ত্রী পরিবর্তন হলেও বিজেপির রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানে মৌলিক কোনও পরিবর্তন আসেনি। নতুন মন্ত্রীও একই রাজনৈতিক-আদর্শিক পরিমণ্ডল থেকে এসেছেন।
প্রতিবাদ দমনের পুরোনো কৌশল এবার কেন কাজ করল না?
বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত তরুণদের আন্দোলনের চরিত্রে।
বিক্ষোভ দমনের ক্ষেত্রে বিজেপির প্রচলিত কৌশল ছিল আন্দোলনকারীদের ‘দেশবিরোধী’, ‘বিদেশি অর্থপুষ্ট’ কিংবা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করা। ২০১৯-২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-বিরোধী আন্দোলনের সময়ও এমন কৌশল দেখা গিয়েছিল।
সিএএ ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা অমুসলিম আশ্রয়প্রার্থীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে দ্রুততর পথ তৈরি করে। সমালোচকদের মতে, স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ধর্মকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
তবে এবারের তরুণদের আন্দোলনকে একইভাবে কোনও একটি ধর্ম, জাতি বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করা কঠিন হয়েছে।
ভার্নিয়েরের মতে, আন্দোলনটি ছিল ‘জাতপাতের ঊর্ধ্বে থাকা একটি আন্দোলন’। বিজেপির তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দু সামাজিক ভিত্তির তরুণদেরও এতে অংশ নিতে দেখা গেছে।
আন্দোলনের আরেকটি শক্তি ছিল আত্ম-ব্যঙ্গ। রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আন্দোলনকারীদের নিয়ে ব্যঙ্গ করার আগেই আন্দোলনকারীরা নিজেদের ‘তেলাপোকা’ পরিচয়কে ব্যঙ্গের অস্ত্র বানিয়ে নিয়েছিলেন।
ফলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত রাজনৈতিক অপবাদ অনেকটাই কার্যকারিতা হারায়।
মোদির জনপ্রিয়তা নিয়েও কি প্রশ্ন উঠছে?
এই আন্দোলন বিজেপির পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিতেও কিছুটা পরিবর্তন এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভার্নিয়েরের মতে, এতদিন তরুণদের একটি বড় অংশের কাছে মোদি ছিলেন আধুনিক, শক্তিশালী ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা নেতা। কিন্তু এবার সেই ভাবমূর্তিতে ফাটল ধরেছে।
তার ভাষায়, ৭৫ বছর বয়সী মোদি প্রথমবারের মতো ‘তার বয়স অনুযায়ী’ জনপরিসরে দৃশ্যমান হচ্ছেন।
তার মতে, আন্দোলনটি তরুণদের কল্পনায় মোদিকে একজন ‘বুমার’ বা পুরোনো প্রজন্মের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিজেপির জন্য এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপনির্বাচনের ফল কি সত্যিই আন্দোলনের প্রভাব দেখাচ্ছে?
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত তিনটি উপনির্বাচনের মধ্যে বিজেপি দুটি আসনে হেরেছে- বিহারের ব্যাংকিপুর এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া। তবে গুজরাটের মঞ্জালপুর আসনটি সহজেই ধরে রেখেছে দলটি। গুজরাটই মোদির নিজ রাজ্য।
বিরোধী নেতারা এই দুই পরাজয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থী আন্দোলনের সরাসরি সম্পর্ক দেখালেও বিশ্লেষকেরা বিষয়টি নিয়ে সতর্ক।
আসিম আলি মনে করেন, ব্যাংকিপুরের ফল থেকে বিজেপির জাতীয় অবস্থান সম্পর্কে বড় কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
ভার্নিয়েরও বলেন, উপনির্বাচনে সাধারণত মোট ভোটারের তুলনামূলক ছোট একটি অংশ ভোট দেয়। ফলে এর ফলাফলকে জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা ঝুঁকিপূর্ণ।
তার মতে, বিজেপির রাজনৈতিক কাঠামো অতীতে একাধিক ধাক্কা সামলে আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
এর উদাহরণ হিসেবে তিনি হরিয়ানার কথা উল্লেখ করেন। কৃষকদের দীর্ঘ এক বছরের আন্দোলনের পরও কয়েক বছর পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজেপি রাজ্যটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তার মতে, সেই নির্বাচন কৃষকদের আন্দোলনের ওপর নয়, বরং জাতপাতের সমীকরণকে কেন্দ্র করে লড়াই হয়েছিল।
অর্থাৎ বদলটি এখনও ভোটের সংখ্যায় স্পষ্ট নয়। বরং বিজেপিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হচ্ছে, সেটিই ধীরে ধীরে বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
আন্দোলনের মাঠে বিরোধী এমপি
নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরে চলা তরুণদের আন্দোলনে নিয়মিত উপস্থিত থাকা রাজনীতিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উত্তর প্রদেশের কৌশাম্বীর ২৭ বছর বয়সী সমাজবাদী পার্টির এমপি পুষ্পেন্দ্র সরোজ।
তার মতে, কয়েকশ মানুষ দিয়ে শুরু হওয়া সমাবেশ পরে হাজারো মানুষের জমায়েতে পরিণত হয়। বিশেষ করে কর্মী সোনম ওয়াংচুক ২০ দিনের অনশন শেষে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে।
সরোজের মতে, সরকারের ‘আগ্রাসী অবস্থান’ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে। তার দাবি, কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবতা, বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহে কথিত কাটছাঁট এবং ২০ জুলাই নয়াদিল্লিতে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ- এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের সহানুভূতি আন্দোলনকারীদের দিকে যায়।
একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাবেক সেনাসদস্য এমনকি কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তাদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা সামনে আসে।
সরোজের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগও তখনই ঘটে, যখন অভিযোগের তীর সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দিকে যেতে শুরু করে।
তার ভাষায়, বিষয়টি ছিল আরও সহজ- ‘কেউই শিশুদের মার খেতে দেখতে পছন্দ করে না।’
আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ অবশ্য এটিকে শুধু একটি ব্যঙ্গাত্মক ইনস্টাগ্রাম পেজ কিংবা একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা হিসেবে দেখছেন না।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সম্পাদক অঞ্জলির মতে, এটি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
তার ভাষায়, এই আন্দোলনের সূত্রপাত কোনও একটি মন্তব্য কিংবা নির্দিষ্ট কোনও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় হয়নি। বরং গত ১২ বছর ধরে দেশের তরুণদের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে এসেছে।
অঞ্জলির মতে, সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাতভিত্তিক বৈষম্য এবং নারীবিরোধী রাজনীতি বন্ধ না হলে এই আন্দোলনকে কোনওভাবেই বিজয় হিসেবে দেখা যাবে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্দোলন শেষ হওয়ার পরও মুসলিম ও দলিত শিক্ষার্থীরাই প্রথমে গ্রেফতার, ভয়ভীতি ও পুলিশি মামলার মুখে পড়েছেন।
২০১৯ সালে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময় দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের অভিযানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
গোয়া রাজ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ উদযাপন এবং কারাগারে থাকা দুই কর্মী উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের সমর্থনে কথিত পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে দুই তরুণকে আটকের ঘটনাকেও অঞ্জলি একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনী রাজনীতিতে নামবে কি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’?
আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন হল- সিজেপি কি সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করবে?
আসিম আলি, জিল ভার্নিয়ের এবং অঞ্জলি- তিনজনই মনে করেন, আপাতত এমন সম্ভাবনা কম।
ভার্নিয়েরের মতে, নির্বাচনী রাজনীতিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি কৌশলগতভাবে বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে আম আদমি পার্টির (এএপি) কথা উল্লেখ করেন। একসময় প্রতিবাদী আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এএপি সফল হলেও ক্ষমতায় এক দশক কাটানোর পর একসময় তাদের অনেক সাবেক ঘাঁটিতেই দলটি হতাশার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
জাতীয় পর্যায়ে একটি রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ, স্বেচ্ছাসেবক এবং সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন। তরুণ ও অনেক ক্ষেত্রে বেকার বা অর্ধবেকারদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলনের পক্ষে সেই সম্পদ জোগাড় করা কঠিন।
তাই সিজেপির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্ভবত সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতির বদলে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।
অর্থাৎ একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তির পরিবর্তে তারা ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট চাপগোষ্ঠী’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিজেপি কি হিন্দুত্বের রাজনীতি থেকে সরে আসবে?
বিশ্লেষকদের বড় অংশের ধারণা, তরুণদের আন্দোলনের কারণে বিজেপি তার মূল হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি থেকে সরে আসবে- এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
আসিম আলি বলেন, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা নিয়ে তরুণদের দাবির মুখেও বিজেপি তার হিন্দুত্বের রাজনৈতিক এজেন্ডা দুর্বল করবে না। বরং নির্বাচনের প্রধান ইস্যু হিসেবে ধর্মীয় পরিচয়কে আরও জোরালোভাবে সামনে আনার চেষ্টা করতে পারে।
অর্থাৎ বিজেপির জন্য সমীকরণটি হতে পারে- তরুণদের কিছু দাবিতে প্রতিক্রিয়া দেখানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ভাষা ব্যবহার করা এবং প্রচারণার কৌশল বদলানো; কিন্তু মূল রাজনৈতিক আদর্শে বড় পরিবর্তন না আনা।
ক্ষমতা আছে, কিন্তু বৈধতা কি কমছে?
বিজেপির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই।
ভার্নিয়েরের মতে, নির্বাচনী দিক থেকে বিজেপি এখনও আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় শক্তিশালী। নির্বাচন জেতার সক্ষমতা, বিরোধী দলের নেতাদের দলবদলে উৎসাহিত করার ক্ষমতা এবং বিপুল নির্বাচনী ব্যয়- সব ক্ষেত্রেই বিজেপি প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বৈধতার জায়গায়।
তার মতে, আন্দোলন বিজেপির বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যতটা না ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তার চেয়ে বেশি আঘাত করেছে জনগণের আনুগত্য ও সম্মতির ওপর দলটির প্রভাবকে।
অর্থাৎ বিজেপি এখনও মানুষকে নির্বাচনে ভোট দিতে প্রভাবিত করতে পারে, বিরোধীদের দুর্বল করতে পারে এবং ক্ষমতায় থাকতে পারে। কিন্তু নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার রাজনৈতিক বয়ান মেনে নেওয়ার ক্ষমতা আগের মতো আছে কি না- সেটিই এখন প্রশ্ন।
এই ব্যবধানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বিজেপির হাতে রয়েছে বিপুল রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা; অন্যদিকে তরুণদের একটি অংশ ক্রমেই দলটির রাজনৈতিক ভাষা, নীতি ও কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করছে।
এই দূরত্ব কোনও একটি উপনির্বাচনের জয় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় একটি ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে সহজে দূর করা যাবে না।
সাম্প্রতিক ‘ককরোচ’ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য সম্ভবত এখানেই- এটি বিজেপির ক্ষমতার ভিত তাৎক্ষণিকভাবে নাড়িয়ে দেয়নি, কিন্তু দলটির রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও জনগণের আনুগত্যের মধ্যে তৈরি হওয়া ফাঁকটিকে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
এখন দেখার বিষয়, বিজেপি সেই ফাঁক পূরণে কেবল প্রচারণার ভাষা বদলাবে, নাকি তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান, শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবিগুলোর প্রতিও বাস্তব নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সাড়া দেবে।
সূত্র: আল-জাজিরা



















