চিকিৎসকরা আমাদের বিপদের বন্ধু

আমেরিকায় অনেক বাংলাদেশী চিকিৎসক- করোনায় আক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে তারাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন! বিষয়টি খুবই বেদনার, কষ্টের! কারণ তারা বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের মানুষকেও সেবা দিতে পারতেন। বাংলাদেশেও চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে চিকিৎসকের! চিকিৎসকদের মৃত্যু হলে আমেরিকার মতো আমাদের দেশেও হিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, আমাদের অনেক বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে; অপূরণীয় ক্ষতি হবে! তাই চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে সমলোচনা বাদ দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকদের জীবন বাঁচাতে হবে। চিকিৎসকরা আমাদের বিপদের বন্ধু।

ঢাকায় ধানমন্ডি বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজের উল্টো পাশে ছিলো আমাদের অফিস। আমি তখন আমেরিকান একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় মিডিয়া বা গণমাধ্যম বিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলাম। প্রয়াত নারী নেত্রী একশন এইডের সাবেক দেশস্থ প্রতিনিধি ড. নাসরীন হক ছিলেন আমার সহকর্মী। অফিসের আইইসি ম্যাটেরিয়ালস / IEC – Information Education Communications materials প্রকাশনার সংগেও আমাকে জড়িত থাকতে হতো।

আমাদের দেশস্থ পরিচালক ছিলেন আমেরিকান ডাক্তার, MD PhD. অন্যান্য কর্মকর্তারাও বেশিরভাগই ছিলেন দেশি বিদেশি ডাক্তার। সে সব কারণে বিভিন্ন দেশের ডাক্তার সহকর্মীদের সংগে কাজ করার সুবাদে তাদের আচার আচরণ সংস্কৃতি খুব কাছ থেকে দেখার ও জানার সুযোগ হয়েছে আমার। কর্মজীবনে প্রচুর বিদেশী বিদেশীনির সংগে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তাদের অনেকেই চিকিৎসক। অনেকেই MD PhD.অর্থাৎ Medical Doctor এবং Doctor of Philosophy. সাদা চামড়া কালো চামড়া সব রংয়ের বর্ণের, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের এবং মহাদেশের মানুষের সংগেই কাজ করেছি।

যাহোক, ডাক্তারি বা এমবিবিএস পড়লে চতুর্থ বর্ষে পড়াকালিন তাদের কমিউনিটি মেডিসিন/ Community medicine বিষয়ে পড়তে হয়। তখন তাদের Scrap book তৈরী করতে বিভিন্ন ধরণের আইইসি ম্যা টেরিয়ালস যেমন স্বাস্থ্য বিষয়ক পোষ্টার লিফলেট ইত্যাeদি প্রয়োজন হয়। সে সবের প্রয়োজনে বাংলাদেশ মেডিক্যালের অনেক ছাত্র ছাত্রী আমাদের অফিসে আমার কাছে আসতেন। ফলে অনেকের সংগে আমার গভীর সুসম্পর্ক তৈরী হলো। পরবর্তীতে তারা দেশে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। কেউ কেউ বাংলাদেশ মেডিক্যালেও অধ্যাপক হিসেবে আছেন। অনেকের সংগেই আমার যোগাযোগ আছে দেখা হয় কথা হয় চিকিৎসা সেবা নিতে তাদের কাছে যাই। তবে তাদের আন্তরিক সেবা সারা জীবন মনে থাকবে। তারাও আমাকে মনে রেখেছেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যালে সে সময় উচ্চবিত্তদের সন্তানেরা পড়ার সুযোগ পেতেন। কারণ অনেক টাকা খরচ হতো। তাদেরকে দেখেছি রায়ের বাজার বস্তির দরিদ্র মানুষদের আন্তরিক সেবা দিতে। ডাক্তারদের নিজের টাকা দিয়ে দরিদ্র রোগীদের ওষুধ কিনে দিতে। ধনী দরিদ্র কোনো ভেদাভেদ দেখিনি। আমাদের অফিসের বিদেশী ডাক্তারদেরও দেখেছি রোগীদের প্রতি অনেক আন্তরিক। আমরা খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, ভিটামিন এ এর অভাবে দৃষ্টিহীনতা, ডায়াবেটিসের কারণে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথী এসব বিষয়ে চিকিৎসক, গবেষকদের সংগে কাজ করেছি। পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে দূর্গম/Hard to reach বা Remote পাহাড়ি এলাকায় চিকিৎসকদের সংগে নিয়ে শিশুদেরকে ভিটামিন এ ক্যা্পসুল খাইয়েছি।

যাহোক, ব্যক্তি বা পরিবার ভেদে সব পেশার মানুষই যেমন ব্যাতিক্রম আছে তেমনি চিকিৎসক স্বাস্থ্য কর্মীরাও তার বাইরে নয়। মোট কথা আমার জীবনে শতাধিক দেশি বিদেশি চিকিৎসকের সংগে পরিচয় হয়েছে কাজ করার সুযোগ হয়েছে।আমাদের দেশে বেশিরভাগ চিকিৎসক তাদের পেশায় আন্তরিক। যাদের কারো কাজের প্রতি আন্তরিকতার অভাব থাকলে তাদের সংখ্যা হাতে গোনা, খুব কম। ষোলো কোটি মানুষের আশ্রয় বা ভরসার স্থল ঘুরে ফিরে আমাদের দেশের ডাক্তাররাই। ধনীরা বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলেও প্রথমে তারা দেশি ডাক্তারদের স্মরণাপন্ন হন। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের অনেক চিকিৎসক, অধ্যাপক আছেন।সুতরাং ব্যকক্তিগত বা পারিবারিক অথবা প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা অসুবিধার কারণে কোনো চিকিৎসক কর্তব্যে অবহেলা করলে সমাধানের পথও আছে।

আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে পারে। তবে লঘু পাপে গুরু দন্ড কখনোই কাম্য নয়, সমর্থনযোগ্য ও নয়। কারণ করোনাভাইরাসের এই দু:সময়ে বা যে কোনো মহামারীর সময়ে ডাক্তাররাই আমাদের আশ্রয় বিপদের বন্ধু। এবং এখনো সকল চিকিৎসক স্বাস্থ্যকর্মী তাদের কর্মস্থলেই আছেন, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদেরও নির্ভয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিচ্ছেন। অনেকেই মৃত্যুঝুকি মাথায় নিয়েইতো কাজ করছেন। তাই সকল চিকিৎসকের অসাধারণ অবদান বা সর্বোচ্চ ত্যাগের কাছে আমরা চির ঋণী; সেই ঋণ সত্যিই অপরিশোধ্য। তদেরকে যে ভাষাতেই যত বেশিই ধন্যবাদ অভিনন্দন জানাই এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি তাতে কম বলা হবে। বরং তাদেরকে বড় মাপের পুরস্কার দিতে হবে। চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সকলকে ঢালাওভাবে সমালোচনা বা গালমন্দ করলে বোকামী হবে; বিষয়টা অনুচিত, কখনোই কাম্য নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়, তাই কাউকে তিরস্কার নয়।

ডাক্তাররাও আমাদের মতোই মানুষ। তাদেরও অসুখ বিসুখ হয়। তাদেরও ঘর সংসার বউ সোয়ামী ছেলে মেয়ে আছে। তাদেরও পেট আছে, খেতে হয় বেচে থাকতে হয়। অতএব, বর্তমান করোনাভাইরাসের মহামারী মোকাবেলায় জীবনের ঝুকি নিয়েও চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রতি মন থেকে অন্তর থেকে আমাদের অশেষ ধন্যবাদ, অভিনন্দন, অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, নিরন্তর শুভকামনা। মানবতার জয় হোক। জীবনের জয় হোক। জয় হোক মানুষের।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বৈশাখী নিউজইডি