স্বেচ্ছাসেবক লীগের কমিটিতে আর্থিক কেলেঙ্কারী, অভিযোগ সাঈদের বিরুদ্ধে

সম্মেলনের তিন বছর পুর্তির ঠিক দুই মাস আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিনের পূর্নাঙ্গ কমিটি ঘোষনা হলেও আর্থিক লেনদেন আর নানা অনিয়মে নেতাকর্মীদের কাঠগড়ায় দাড়াতে হচ্ছে সংগঠনের দায়িত্বশীলদের। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তারিক সাঈদের বিরুদ্ধে ওঠা ওই অভিযোগ নিয়ে বিব্রত কেন্দ্রীয় নেতারা এরই মধ্যে বিষয়গুলো নিয়ে তদন্তের কথা ভাবছে।

স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ-উত্তর শাখার সর্বশেষ সম্মেলন ২০১৯ সালের ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়। ১৬ নভেম্বর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখায়ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়।

দক্ষিণের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন কামরুল হাসান রিপন এবং সাধারণ সম্পাদক হন তারিক সাঈদ। উত্তর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি হন ইসহাক মিয়া ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান নাঈম।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর মেয়াদি এই কমিটি দুই বছর ১০ মাস পার হওয়ার পর ১’শ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়েছে গত ৭ সেপ্টেম্বর। দীর্ঘদিন পর কমিটি নিয়ে নেতাকর্মীদের সন্তোষ প্রকাশ করলেও বেশ কিছু অনিয়মে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে স্বোচ্চার। এ নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েছেন সংগঠনের কেন্ত্রীয় নেতারা।

তারা বলছেন, স্বেচ্ছাসেবক লীগ গঠনের পর থেকে এরকমভাবে প্রেস রিলিজের মাধ্যমে শীর্ষ নেতৃত্বের স্বাক্ষরসহ কমিটি গঠন আগে হয়নি। এদিক দিয়ে এবারের কমিটি সফল। তবে যে ধরনের অনিয়মের কথা উঠেছে সেটি নিয়ে তারা বেশ বিব্রত। এ নিয়ে শিগগিরই তদন্ত করবেন তারা। তবে যারা এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের রাজনীতি না করাই উচিত বলেও তারা মনে করেন।

জানতে চাইলে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু বলেন, ‘এসব বিষয় আমাদের কানেও এসেছে। বিষয়গুলো অবশ্যই আমর খতিয়ে দেখবো। অনিয়ম হয়ে তাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহানগর ও কেন্দ্রীয় বিভিন্ন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কমিটি করার ক্ষেত্রে নেতা বানানোর ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেন, ব্যক্তিসম্পর্ক, নিজের এলাকাকে প্রধান্য দেয়া, সিনিয়র নেতাদের জুনিয়রদের নিচের পদে পদায়ন, চিহ্নিত সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজি, সরকারি চাকুরীজীবিদের নিয়ম বহির্ভূতভাবে কমিটিতে পদ দিয়েছেন। এসব নিয়ে স্বোচ্চার অনেক নেতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন। ত্যাগী ও যোগ্যদের পদ না দেওয়ায় এ নিয়ে পদত্যাগ করেছেন সদ্য ঘোষিত কমিটিতে পদ পাওয়া রিশাদ আহমেদ রুশদী।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা মহানগর দক্ষিন আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ এর পাওয়া আমার পদটি থেকে আমি পদত্যাগ করলাম। আমি আগেই দক্ষিন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তারিক সাঈদ কে কমিটির আগেই জানিয়ে ছিলাম বিষয়টি। এর কারন অরাজনৈতিক এবং ব্যবসায়ী, একবছর ধরে রাজনীতি করা, বানোয়াট সিভি বানিয়ে, এই মহানগরে রাজনীতি করে নাই এমন লোককে ব্যক্তি স্বার্থের জন্য মূল্যায়ন করা হয়েছে।’

“এমন কি রাষ্ট্রীয় আইনের বাইরে গিয়ে সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাকেও ব্যক্তি স্বার্থে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিন বছর ধরে ঢাকা শহরে আসা বেতনভুক্ত চামচাদের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে, অথচ কারো সিভি দেখে নির্নয় করা হয়নি পদ পদবি। সিভি যাচাই করলে বুঝতে পারবেন কেমনভাবে বানিয়েছে। আসলে সেই কমিটিতে আমি বেমানান। কারো গাড়ি ব্যবহারের কারনে বিএনপির জামাতা হয়েছে সহ সভাপতি অথচ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা সাবেক ও মহানগর দক্ষিন এর সাবেক ছাত্রনেতারা জায়গা পাইনি এবং সদস্য পদ পায়।”

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছে এটি ভারী অন্যায় করা হয়েছে সংগঠনের সাথে । আর আমি এইসব অন্যায়ের সাথে নিজে মানান সই নই। আমি পদত্যাগের পূর্বে প্রশ্ন রাখলাম এরা কবে এই ঢাকা শহরের রাজপথে কোন অবদান দেখেছিলেন। জামাকাপড়, শাড়ি এসব সাপ্লাই দিয়েও যে নেতা হওয়া যায় আমার জীবনে প্রথম দেখলাম। কোন ধরনের রাজনীতি নাই তারা গাড়িতে সার্ভিস দিলে সহ সভাপতি হয় তাও প্রথম দেখলাম। ঘরের বাজার করলে সাংগঠিনক সম্পাদক হওয়া যায় তাও আমি প্রথম দেখলাম। অতএব কমিটি তে আমি বেমানান। আমি নিজে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলাম, কারন কমিটির আগেই তারিক সাঈদের সাথে বিষয়টি জানিয়ে ছিলাম।’

টাকা নিয়ে কমিটিতে না রাখার অভিযোগ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক আজিজ বেপারী।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তারিক সাঈদ, ২০১৯ সালে দায়িত্ব পাওয়ার পড়ে বদলে যায় তার রূপ। বাসার বাজার, বাসার ভাড়া এমন কি বাচ্চাদের খাবার এবং ভিক্ষার টাকা প্রতিটি কর্মীদের কাজ থেকে দিতো। তার কাছে জামাত-শিবির বলতে কিছু নাই, টাকা যে দিবে সে মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা বানাবে এমনই ছিল তার সবসময় মনোভাব।’

“সে আমার কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেয় এই কথা বলে যে, আমাকে ভালো জায়গায় রাখবে। কিন্তু কি দেখলাম! ২০১৯সালে স্বেচ্ছাসেবক লীগ করতে আসা প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে পদপদবি দেয়। পুরান কমিটির একটা লোককেও কোথা রাখে নাই। এটা কোন সেবা শান্তি প্রগতি জাতি জানতে চায়। আর আমার কথা শতভাগ সত্যি মিথ্যা প্রমান হলে রাজনীতি আর করবোনা”, বলেন তিনি।

অভিযোগ উঠেছে, তারিক সাঈদ বিপুল টাকার বিনিময়ে কমিটিতে পদ দিয়েছেন, যোগ্য, ত্যাগী এবং পুরোনো কমিটির অনেককেই তিনি মুল্যায়ন করেননি। যাদেরকে মাঠের রাজনীতি করতে কখনো দেখেননি বা কয়েকমাস হলো রাজনীতিতে এসেছেন তারও পদ বাগিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু বাদ পড়েছেন দীর্ঘদিনের পরীক্ষিতরা।

নতুন পদ পাওয়া বিপ্লব, লিটন, রায়হান ও সুমনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে রিশাদ আহম্মেদ রুশদী ফেসবুকে লেখেন লিখেন, ‘আমি তাদের রাজনৈতিক পরিচয়টা জানতে চাই। তারা এই ঢাকা মহানগরে অতীতে কি এমন অবদান রেখেছেন? তাদের সিভিতে কি এমন পাইছে যেইটা দেখে এই পোষ্ট দিতেই হলো। একটু জানতে চাই।’

তিনি আরও লিখেন, ‘কে এই বিপ্লব? কবে কোথায় রাজনীতি করেছে? তার ব্যাকগ্রাউন্ড কি? কিসের কারনে সে সহ-সভাপতি? সাংগঠনিক সম্পাদক লিটন সে তো বেতন ভুক্ত কর্মচারী। যার এই ঢাকা শহরে আসার বয়স তিন বছর, সে কিভাবে সাংগঠনিক সম্পাদক হইলো।’

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তারিক সাঈদ বলেন, ‘অনেকে পদ না পেয়ে আমার বিরুদ্ধে এসব বলছে। কমিটিতে পদ দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি। যোগ্য যারা তারাই পদ পেয়েছেন। ‘

স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সভাপতি কামরুল হাসান রিপন বলেন, ‘যোগ্য এবং পরীক্ষিতদের দিয়েই কমিটি ঘোষনা করা হয়েছে। এতে কোনো প্রকার অনিয়ম হয়নি। এরপরও যেহেতু কথা উঠেছে, প্রয়োজনে আমরা কেন্দ্রীয় সভাপ‌তি ও সাধারণ সম্পাদক‌ের স‌ঙ্গে আ‌লোচনা ক‌রে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা যাবে।’