জামায়াতপন্থী পরিবারের সন্তান উপজেলা আ.লীগের নব-নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক !

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের নব নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদকের পরিবারের সবার বিরুদ্ধে জামায়েত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে,  নবগঠিত ওই কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম মহিবুল হাসান মুকিত। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার বাবা গাইবান্ধা জেলায় জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির এবং পলাশবাড়ী উপজেলা শাখার জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি ছিলেন। এবং মুকিত নিজে কখনও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিল না।

ওই কমিটিতে সভাপতি পদে উপাধ্যক্ষ শামিকুল ইসলাম লিপন, সহ সভাপতি অধ্যক্ষ স্যাইফুলার রহমান চৌধুরী তোতা, সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম মণ্ডল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বাবু, সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান মুকিতের নাম ঘোষণা করা হয়।

কমিটি ঘোষণার পর পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক মো. আমিনুল ইসলাম মুকিতের বাবা-মা ও মুকিতের জামায়েত সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বরাবর আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। দপ্তরে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা অভিযোগ পাওয়ার কথা জানান।

অভিযোগে মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “মুকিত এর আগে পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এমনকি তার বাবা জামায়েত ইসলামীর গাইবান্ধা জেলা শাখার সাবেক ভারপ্রাপ্ত আমীর এবং পলাশবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি ছিলেন। মুকিতের মা পলাশবাড়ী সরকারি কলেজের ১৯৯২-১৯৯৩ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে প্রকাশ্যে ছাত্র শিবিরে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন। সে নিজেও কখনও পলাশবাড়িতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল না, হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছে। আমরা সাংগঠনিক সম্পাদক পদ থেকে সরানোর পাশাপশি পরিবারে অন্য কাউকেও যেন আর কোন পদে না রাখা হয়, এবং এই পদে আওয়ামী পরিবারের কাউকে নিযোগ করা হয়।”

এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের অভিভাবক, আমি উনার কাছে এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরর কাছে অভিযোগ দিয়েছি। মুকিতের পরিবার এবং তাদের জামায়েত সংশ্লিষ্টতার বহু প্রমান পলাশবাড়ির আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে পাবেন, আমার কাছেও আছে, তাই আমি অভিযোগ দিয়েছি।”

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের দায়িত্ব প্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনাক সম্পাদক শাখাওয়াত হোসেন শফিক বলেন, “এই বিষয়ে একটি অভিযোগ এসেছে। আমরা জেলা আওয়ামী লীগের পরামর্শ অনুযায়ী কমিটি ঘোষণা করেছি। এখন জেলা আওয়ামী লীগকে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। ঘটনা সত্য হলে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেব।”

এ বিষয়ে সদ্য ঘোষিত পলাশবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি ও পলাশবাড়ি আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ স্যাইফুলার রহমান চৌধুরী তোতা বলেন, “মুকিতের নাম আমার পর পরই সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা করে, তখন থেকেই মনের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট নিয়ে আছি। প্রকৃত পক্ষে মুকিতের নানা মৌলভী মো. আব্দুস ছামাদ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন আজিজুর রহমান বিএনসি। তখন আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদন্দ্বিতা ছিল ছামাদ সাহেবের সঙ্গে। সেই লোকের নাতি মুকিত।

তার মা কলেজের অধ্যক্ষ্য ছিলেন তখন শিবিরের ছেলের নিয়ে মিটিং করতেন। বিভিন্ন ভাবে সহযোগীতা করতেন।
“মুকিতের বাবা একজন জামায়েত নেতা, দীর্ঘ দিন ধরে জামায়েতের বিভিন্ন পদে থেকে পরে মারা যান।”

তোতা চৌধুরী বলেন, ” তার বাবা পলাবাড়ি কলেজ সরকারি হওয়ার আগে চাকরি করতো, পরে ১৯৮৭ সালে এরশাদ সাহেব সরকারি কলেজ ঘোষণা করলে মুকিতের বাবাকে আর সরকারিকরণ করে নি। পরে কিছু দিন চাকরি করেছিল। ১৯৯৪ সালের দিকে চাকরি ছেড়ে জামায়েতের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। পরে মারাও গেছেন, আমি ৭০ এর নির্বাচনে মুকিতের নানার বিরুদ্ধে ভোটের কাজ করেছি। আমি সব জানি, তাদের সভাইকে চিনি। মুকিতও কখনও এলাকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে নি। আমি সত্য বলতে ভয় পাইনা, সারাটা জীবন আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করেছি, দুইবার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, একবার সভাপতি, ২০০৪ সাল থেকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি আছি, এবারও বানানো হয়েছে। জামায়াত পরিবারের এই সদস্যকে সহকর্মী হিসাবে নিঢে কাজ করা খুবই কঠিন হবে।”

অভিযোগের বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ও পলাশবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ সভাপতি আলী মোস্তফা রেজা বলেন, “পলাশবাড়িতে ৩৫ বছর শিক্ষকতা করেছি, ৬৮ সালে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে যুক্ত ছিলাম। এখন পলাশ বাড়ি আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে মুকিত নামে যে ছেলেটা সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছে, তার বাবা জামায়েতের লোক। তাদের বাড়িতে জামায়েতের সব কর্মকান্ড পরিচালিত হতো। তাদের বাড়ি থেকে ২০০৪-৫ সালের দিকে আমরা শিবিরের মেস উচ্ছেদ করেছি। মুকিতের মা সবসময়ই শিবিরের ছেলেদের বিভিন্নভাবে সুযোগ সুবিধা দিত এটা নতুন কথা নয়। এই পরিবারের ছেলে সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ায় আমরা আসলে ব্যথিত। কারণ মুকিতের নানা তৎকালিন সময়ে শান্তি কমিটির নেতা ছিল। সরাসরি রাজাকার ছিল।”

তবে এ বিষয়ে মহিবুল হাসান মুকিত বলেছেন, রাজনৈতিক ভাবে ক্ষতি করতে তার বাবা-মার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলা হয়েছে।  চলতি বছরের ১৩ মার্চ পলাশবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগ।